বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার তাদের ইশতাহারে এ দেশের অর্থনীতির আকার আগামী ১০ বছরের ব্যবধানে ট্রিলিয়ন ইউএস ডলারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। ১০ বছরের ব্যবধানে অর্থনীতির আকার দ্বিগুণ করতে হলে গড় নিয়মে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে প্রায় ১০ শতাংশ। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক অর্থনীতির নানামুখী চাপ, বিভিন্ন দেশে চলমান যুদ্ধ ও সংকোচনশীল অবস্থা বিদ্যমান বিধায় ক্ষমতাসীন সরকারের ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্যমাত্রা আগামী এক দশকে অর্জনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। আবার সার্বিক দিক বিবেচনায় অনুরূপ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অসম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে অর্থনীতির অন্যান্য সেক্টরের মতো বীমা খাতের বিস্তারও জরুরি হয়ে পড়বে। দেশজ উৎপাদন তথা জিডিপিতে বীমা খাতের অবদান সেক্ষেত্রে প্রায় ৪ শতাংশের ঘরে উন্নীত করতে হবে। এ দেশের অর্থনীতির বিকাশ, বেকারত্ব ও দারিদ্র্য বিমোচনে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি অর্জন করতে হলে সরকারের উচিত হবে বীমা খাতে বিদ্যমান অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনা ইত্যাদি চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধন এবং বীমা খাতে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়া। মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের বীমা খাত নানামুখী সমস্যায় জর্জরিত। এসব সমস্যা রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়। কিন্তু আগেভাগে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে পারলে সরকার চাইলে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে সেসব সমাধান করতে পারে। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে সমস্যা সমাধানের উৎকৃষ্ট উপায় হচ্ছে চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্য আনয়ন। অনেক সমস্যা ও বিশাল সম্ভাবনার বীমা খাতকে গণমুখী সেবাদানের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে চাহিদা ও জোগান উভয়মুখী সমস্যা চিহ্নিতকরণ এবং আশু সমাধানের কথা ভাবতে হবে।
সার্বিক দিক বিবেচনায় বাংলাদেশের বীমা খাতের প্রধানতম সমস্যা হলো আস্থার সংকট। বীমা খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষ যেমন বীমাকারক, বীমাগ্রহীতা, নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান, সরকারের অন্যান্য মহল ও জনগণ—সব পক্ষের মধ্যেই এ দেশের বীমা সেবা নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। যদিও এরূপ আস্থার সংকট একদিনে তৈরি হয়নি, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এরূপ সংকট ঘনীভূত হয়েছে এবং ক্রমে বেড়েছে। বীমাকারীর সঙ্গে বীমাগ্রহীতার আস্থার সংকটের মূল কারণ বীমা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বীমা দাবি সময়মতো পরিশোধ না করা। সার্বিক পরিসংখ্যান বলছে ২০২৫ সালে বাংলাদেশে নন-লাইফ বীমা খাতে মোট বকেয়া দাবির পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। পক্ষান্তরে ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে উত্থাপিত মোট দাবির বিপরীতে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ৯ দশমিক ৩৭ শতাংশ। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৮২টির মতো বীমা কোম্পানির ব্যবসায়িক কার্যক্রম চলমান আছে, যার মধ্যে ৪৬টি নন-লাইফ আর বাকিগুলো জীবন বীমা প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বীমা কোম্পানির পাশাপাশি এ দেশে বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত বীমা কোম্পানি এবং বিদেশী মালিকানাধীন কোম্পানিও রয়েছে। কিন্তু শুধু নন-লাইফের ক্ষেত্রেই বীমা দাবি পরিশোধের যে দুর্ভাগ্যজনক চিত্র উঠে এসেছে তা বীমাসংশ্লিষ্ট কারো জন্যই সুখকর নয়। প্রায় ৯০ শতাংশ বীমা দাবি অনিষ্পন্ন থাকলে গ্রাহক তো আস্থার সংকটে ভুগবেই। সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত হবে দ্রুত অনিষ্পন্ন বীমা দাবি পরিশোধের জন্য কোম্পানিগুলোকে নির্দেশ দেয়া, যাতে জনগণ কিছুটা হলেও আস্থা ফিরে পায়।
বাংলাদেশের বীমা খাতে দক্ষ জনবলের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। দক্ষ জনবল তৈরি এবং তার ব্যবহারের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা বিগত সরকারগুলো হাতে নেয়নি। দেশের স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিদ্যমান পাঠ্যক্রমে বীমা শিক্ষা একেবারেই অবহেলিত। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বীমা শিক্ষার কোনো স্বতন্ত্র বিষয় নেই। কোথাও কোথাও অন্য কোনো বিষয়ের সঙ্গে দু’একটি কোর্স থাকলেও তা যুগের চাহিদার তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। সেক্ষেত্রে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বীমা শিক্ষার জন্য স্বতন্ত্র বিষয় খোলা যেতে পারে। বীমা শিক্ষা এগিয়ে নিয়ে যেতে সুদক্ষ শিক্ষক ও প্রশিক্ষক তৈরি করতে হবে। ক্ষেত্রবিশেষে স্বল্পকালীন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিদ্যমান জনবলকে দক্ষ সেবাদানের উপযোগী করে গড়ে তোলা যেতে পারে। উল্লেখ্য, দক্ষ জনবল তৈরিতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকেও এগিয়ে আসতে হবে। বেসরকারি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সীমিত পরিসরে হলেও বীমা শিক্ষার জন্য স্বতন্ত্র বিষয় চালু করতে হবে।
বাংলাদেশে বীমা খাতে বেতনবৈষম্য প্রকট। সমসাময়িক এবং সমগোত্রীয় অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের তুলনায় বীমা খাতে তুলনামূলক কম বেতনে চাকরি করতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে সেক্ষেত্রে কিছু ব্যতিক্রম থাকতে পারে। আবার এরূপ প্রতিশ্রুতির জন্য অর্থনৈতিক বাস্তবতাও থাকতে পারে। বাংলাদেশের বীমা ব্যবসার ব্যাপ্তি খুব বেশি না হওয়ায় অনেক কোম্পানি খুব বেশি লাভ করতে পারে না। কম লাভ বা লোকসানি প্রতিষ্ঠান চাইলেও বেশি বেতনে জনবল সংস্থান করতে পারে না। বীমা শিক্ষায় শিক্ষিত ছাত্র-ছাত্রীরা যাতে বীমা খাতে সম্মানজনক চাকরি পান সেদিকেও লক্ষ রাখতে হবে। বীমা খাতে যারা চাকরি করেন এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সবার বেতন-ভাতা যুগোপযোগী করা এবং তাদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধিতে আশু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বীমা শিল্পে চাকরি এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্টতা আগামী প্রজন্মের কাছে আকর্ষণীয় হিসেবে তুলে ধরতে হবে। সেক্ষেত্রে অনেক মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী বীমা শিক্ষায় আগ্রহী হবে এবং বীমা খাতে বর্তমানে দক্ষ জনবলের যে ঘাটতি তা পূরণ হতে পারে।
বীমা একটি বিশেষায়িত শিল্পও বটে। বীমা খাতে হিসাব-নিকাশ একটু ভিন্ন ধরনের বিধায় এ খাতে বিশেষ জ্ঞানের অধিকারী হিসাববিদ তথা একচ্যুয়ারি দরকার হয়। একজন একচ্যুয়ারি ফাইন্যান্স, ব্যাংকিং, হিসাববিজ্ঞান, গণিত ও পরিসংখ্যান প্রভূত বিষয়ে প্রচুর জ্ঞানের অধিকারী হতে হয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সত্যি যে বাংলাদেশে এরূপ একচ্যুয়ারির সংখ্যা খুবই নগণ্য। একজন দক্ষ একচ্যুয়ারি যথেষ্ট আর্থিক সুবিধা পেয়ে থাকেন এবং তাদের সামাজিক মর্যাদাও অনেক বেশি। কিন্তু বাংলাদেশে একচ্যুয়ারি শিক্ষার জন্য খুব বেশি আগ্রহী ছাত্র-ছাত্রী পাওয়া যায় না। বিদেশে অনেক বাংলাদেশী একচ্যুয়ারি সুনামের সঙ্গে কাজ করলেও বাংলাদেশে তারা কাজ করতে অনীহা দেখান। এর সম্যক কারণ খুঁজে বের করে সমাধানের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে সরকারি উদ্যোগে দেশে অথবা বিদেশে একচ্যুয়ারি শিক্ষায় আগ্রহীদের বৃত্তির ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
বাংলাদেশে বীমা কোম্পানিগুলো ব্যবসা সম্প্রসারণে খুব বেশি আগ্রহী নয়। বীমা কোম্পানি ঝুঁকি ব্যবস্থাপক হয়েও যদি ঝুঁকি নিতে অপারগতা দেখায় তবে ব্যবসা সম্প্রসারণ হবে কী করে? বীমা কোম্পানিকে ‘নিশ মার্কেটিং’ করলে হবে না। এ দেশের জেলে, কামার, কুমার, গাড়িচালক, হেলপার, নির্মাণ শ্রমিক, কৃষক, শিল্প শ্রমিক, সরকারি-বেসরকারি চাকুরে, ছেলেমেয়ে, আবাল বৃদ্ধ বনিতা, স্কুল-কলেজসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কলকারখানা, অন্যান্য ভৌত অবকাঠামো, আমদানি-রফতানি বাণিজ্য তথা অর্থনীতির প্রতিটি খাতকেই বীমা সেবার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। সেজন্য স্বল্প-মধ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার। সর্বজনীন বীমা সুবিধা চালুর নিরিখে সরকারের পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। এরূপ গণমুখী বীমা সেবা চালুতে যেসব কোম্পানি অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে তাদের প্রণোদনা দেয়া যেতে পারে। বেসরকারি খাত উদ্বুদ্ধ না হলে সরকারি বীমা কোম্পানির মাধ্যমে হলেও বীমা সেবার বিস্তার করে তা জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে যেতে হবে।
বীমা খাতে প্রাতিষ্ঠানিক এবং আইনি সংস্কার খুবই জরুরি। বেসরকারি ও রাষ্ট্রমালিকানাধীন উভয় ধরনের বীমা কোম্পানিতে সুশাসনের ঘাটতি প্রবল। রাষ্ট্রমালিকানাধীন বীমা কোম্পানিকে আরো প্রতিযোগিতামূলক করা দরকার। নিয়োগ, বদলি, প্রমোশন প্রভূত পর্যায়ে দুর্নীতি, রাজনীতি ও স্বজনপ্রীতি কোনোটিরই আশ্রয়-প্রশ্রয় থাকা চলবে না। জনগণের প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই লাভজনক ও সেবামুখী ধারায় ফিরতে হবে। সেক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কারের আশু পদক্ষেপ নিতে হবে।
বাংলাদেশের বীমা খাতসংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার আইনি এবং কাঠামোগত সংস্কারও সময়ের দাবি। নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্তা-ব্যক্তি হিসেবে যারা দায়িত্ব নেবেন তাদের যথেষ্ট প্রজ্ঞা, দক্ষতা ও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সবার মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন হবে। আইনি সংস্কার এবং তার যথাযথ প্রয়োগ নির্মোহভাবে নিশ্চিত করতে হবে।
সর্বোপরি বাংলাদেশে বীমা খাতকে এগিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় গবেষণা, গবেষণার পরিবেশ, তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা জরুরি। তথ্যের ঘাটতি, অবাধ প্রবাহে বাধা এবং কারসাজিমূলক আর্থিক বিবরণী তৈরি করে লাভ-লোকসান দেখানো প্রভূত অভিযোগ এ দেশে বেশ পুরনো। জনমনে আস্থা ফেরাতে সরকারের উচিত হবে ‘দুষ্টের দমন এবং শিষ্টের পালন’ নীতি অবলম্বন করা। ক্ষমতাসীন সরকারের ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বীমা খাতের সংস্কার খুবই প্রয়োজনীয়। সরকারের উচিত হবে যোগ্য লোককে বাছাই করা এবং সঠিক সময়ে সঠিক পন্থায় পদায়ন করা। ব্যাপক সম্ভাবনাময় এ দেশের বীমা খাতে যোগ্য নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে পারলে জনবান্ধব সরকারের লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
ড. শহীদুল জাহীদ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান
