ইস্টার্ন রিফাইনারি দেশি পেট্রোল উৎপাদনেও লাগে বিদেশি অকটেন

আলোকিতপ্রজন্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৮:৪৫ এএম, বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২৬ | ৯১

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্য বলছে, পেট্রোল উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ। পেট্রোলের পাশাপাশি দেশি উৎস থেকে পাওয়া যায় অকটেনও। তবে চাহিদা মেটাতে অতিরিক্ত অকটেন আমদানি করে বিপিসি। সুত্র: জাগো নিউজ

কিন্তু জাগো নিউজের অনুসন্ধান বলছে, পেট্রোল নিয়ে বিপিসির পুরো তথ্যেই ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’। মূলত আমদানি করা পরিশোধিত অকটেন দিয়ে মানহীন পেট্রোলের সঙ্গে ব্লেন্ডিং করে (মিশিয়ে) বিএসটিআই মানের পেট্রোল বানায় দেশের একমাত্র সরকারি জ্বালানি পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি (ইআরএল)। তার মানে দেশে উৎপাদিত পেট্রোল পুরোপুরি দেশি উৎসের ওপর নির্ভরশীল নয়। 

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি আমদানিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বিপিসিকে। বিশেষ করে তেলের দাম বাড়ার আতঙ্কে দেশজুড়ে ‘প্যানিক বায়িং’ বিপিসির মাথাব্যথার মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি নিয়মিত সরবরাহকারীরা এপ্রিল মাসে কয়েকটি পার্সেল দিতে অপারগতা দেখানোর পর দ্রুত স্পট মার্কেট থেকে পরিশোধিত ডিজেল ও অকটেন আমদানির প্রক্রিয়া হাতে নিয়েছে বিপিসি।

বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসের ১-২৯ মার্চ পর্যন্ত পেট্রোল বিক্রি হয়েছে ৩৬ হাজার ৮৫০ টন। তাতে মার্চ মাসে দিনে গড়ে (প্রথম ২৯ দিনের) পেট্রোল বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ২৭০ মেট্রিক টন।

২০২৪-২৫ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, দেশি উৎস হিসেবে ইস্টার্ন রিফাইনারিসহ সরকারি-বেসরকারি ফ্রাকশনেশন প্ল্যান্ট {যেখানে প্রাকৃতিক গ্যাস বা খনিজ তেল থেকে প্রাপ্ত মিশ্র হাইড্রোকার্বনকে (কনডেনসেট) বিভিন্ন স্ফুটনাঙ্কের ওপর ভিত্তি করে পাতন প্রক্রিয়ায় আলাদা করা হয়} থেকে পেট্রোল পাওয়া গেছে ৩ লাখ ১৫ হাজার ৪৮৫ টন। সে হিসেবে দৈনিক গড়ে পাওয়া গেছে ৮৬৪ দশমিক ৩৪ মেট্রিক টন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিপিসির এক কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিপিসি পেট্রোল আমদানি করে না। দেশি উৎস থেকে পাওয়া পেট্রোল দিয়ে চাহিদা মেটানো হয়। দেশে সাড়ে চার লাখ টনের কিছু বেশি পেট্রোলের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু ইস্টার্ন রিফাইনারিতে কোনো অকটেন উৎপাদন হয় না। দেশি ফ্রাকশনেশন প্ল্যান্টগুলো থেকে পাওয়া অকটেনে দেশের চাহিদা মেটে না। ফলে নিয়মিত অকটেন আমদানি করতে হয়।’

বিপিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে বিপিসির অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে ৬৮ লাখ ৩৫ হাজার ৩৪১ টন জ্বালানি তেল বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে সর্বাধিক ব্যবহার হয়েছে পরিবহন খাতে। পরিবহনে জ্বালানিতে মোট বিক্রিত জ্বালানির ৬৩ দশমিক ৪১ শতাংশ ব্যবহার হয়েছে। পাশাপাশি কৃষিতে ১৫ দশমিক ৪১ শতাংশ, শিল্পে ৫ দশমিক ৯৬ শতাংশ, বিদ্যুতে ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ, গৃহস্থালিতে শূন্য দশমিক ৯৬ শতাংশ এবং ২ দশমিক ৫৯ শতাংশ ব্যবহার হয়েছে অন্য খাতে।

বিপিসির তথ্য বলছে, তিন বিপণন কোম্পানি ও ইস্টার্ন রিফাইনারি মিলে বিপিসিতে পেট্রোল মজুত সক্ষমতা রয়েছে ৩৭ হাজার ১৩ মেট্রিক টন। চলতি (২০২৬) সালের জানুয়ারি মাসে পেট্রোল বিক্রি হয়েছে ৩৩ হাজার ৯৩৮ টন, ফেব্রুয়ারি মাসে বিক্রি হয়েছে ৩৬ হাজার ৫৯ টন। একইভাবে ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে পেট্রোল বিক্রি হয়েছিল ৩৪ হাজার ৯১৭ মেট্রিক টন এবং ফেব্রুয়ারিতে ৪১ হাজার ১৯৯ মেট্রিক টন।

২০২০-২১ অর্থবছরে পেট্রোল বিক্রি হয়েছিল ৩ লাখ ৭৮ হাজার ৮৪৬ টন, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৬৪৭ টন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৪ লাখ ৫৪ হাজার ৫৫৬ টন এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিক্রি হয় ৪ লাখ ৩০ হাজার ৯৫২ টন। সবশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পেট্রোল বিক্রি হয় ৪ লাখ ৬২ হাজার ৪৭৫ টন। এতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দৈনিক গড়ে বিক্রি ও ব্যবহার হয় ১ হাজার ২৬৭ মেট্রিক টন (৩৬৫ দিনের হিসাবে)।

বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে পেট্রোল আমদানি না হলেও অকটেন আমদানি হয় নিয়মিত। আমদানিতে অকটেনকে মোগাস (মোটর গ্যাসোলিন) হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়। ২০২০-২১ অর্থবছরে অকটেন আমদানি হয়েছিল ২ লাখ ৮৮ হাজার ২৮০ টন, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪ লাখ ৩৬ হাজার ৫১৫ টন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৮৬৬ টন এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আমদানি হয় ২ লাখ ৫৯ হাজার ৬৪৭ টন। সবশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অকটেন আমদানি হয় ২ লাখ ৫৮ হাজার ৫৮২ মেট্রিক টন।

ইআরএলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিপিসির আমদানি করা ১ লাখ ১৬ হাজার ৯৯১ টন পরিশোধিত অকটেন পায় ইআরএল। বিপিসি বলছে, ওই অর্থবছর ইআরএলে পেট্রোল উৎপাদিত হয়েছে ৫৯ হাজার ১৫০ টন। এসব পেট্রোলের সাথে অকটেনগুলো মেশানো হয়। সরকারি-বেসরকারি ফ্রাকশনেশন প্ল্যান্ট থেকে পেট্রোল পাওয়া যায় ৩ লাখ ১৫ হাজার ৪৮৫ টন। একই সময়ে বিপিসির অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলো ওই অর্থবছর পেট্রোল বিক্রি হয়েছে ৪ লাখ ৬২ হাজার ৪৭৫ টন।

এ কথা প্রসঙ্গে ইআরএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌদশলী শরীফ হাসনাত জাগো নিউজকে বলেন, ‘আগে পেট্রোলের রন মান ৮০ ছিল। এখন বিএসটিআই পেট্রোলের রন নির্ধারণ করেছে ৮৯। ইআরএলের প্ল্যান্টটি প্রায় ৬০ বছরের পুরোনো। এখানে পেট্রোল উৎপাদিত হলেও বিএসটিআই মানের করতে পরিশোধিত অকটেনের সঙ্গে ব্লেন্ডিং করতে হয়।’

বাংলাদেশে বিএসটিআইয়ের মান অনুযায়ী বর্তমানে সাধারণ পেট্রোলের ন্যূনতম রন (রিসার্চ অকটেন নম্বর) মান হলো ৮৯। ২০১২ সালের আগে পেট্রোলের রন ছিল ৮০। বিগত সময়ে পরিবেশদূষণ রোধ এবং যানবাহনের ইঞ্জিনের কার্যক্ষমতা বাড়াতে বিএসটিআই পর্যায়ক্রমে এই মান উন্নত করেছে। ২০১২ সালে পেট্রোলের রন নির্ধারণ করা হয় ৮৭। পরবর্তীসময়ে ২০১৯ সালে পেট্রোলের রন ৮৯ নির্ধারণ করে বিএসটিআই।