মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে সংকট প্রভাব মোকাবেলায় বহুমুখী আগাম উদ্যোগ চান শিল্পোদ্যোক্তারা

আলোকিতপ্রজন্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৮:৩১ এএম, বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২৬ | ৮৭

লমান যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে।

এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রথাগত ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে ‘প্রো-অ্যাক্টিভ’ বা আগাম ও বহুমুখী উদ্যোগ নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তারা। তাদের মতে, হঠাৎ করে সংকটে পড়ার চেয়ে পরিকল্পিতভাবে কৃচ্ছ্রসাধন এবং জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তার মতো কৌশলগত খাতে আমূল সংস্কার এখন সময়ের দাবি।

দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও জ্বালানি পরিস্থিতি মোকাবেলায় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে করণীয় নির্ধারণে একাধিক শিল্পোদ্যোক্তার সঙ্গে কথা বলেছে বণিক বার্তা। তাদের আলোচনায় উঠে এসেছে আটটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ ও প্রস্তাব। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে জ্বালানি নিরাপত্তা ও বিকল্প জ্বালানির উৎস খোঁজার ওপর। পাশাপাশি সহনীয় পর্যায়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়ানোর বিষয়েও জোর দেয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে ভ্যাট আহরণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে খাতভিত্তিক তদারকি জোরদারের পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর কার্যকারিতা বাড়াতে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়ারও পরামর্শ দিয়েছেন উদ্যোক্তারা। এছাড়া আর্থিক খাতে নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা ও প্রয়োজনীয় সংস্কার, বৈচিত্র্যময় সোর্সিং নিশ্চিত করা এবং বিদেশে বাণিজ্যিক দপ্তরের কার্যকর ভূমিকা বাড়ানোর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

শিল্পোদ্যোক্তাদের মতে, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোও বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জ্বালানি নিরাপত্তায় তারা বিকল্প উৎস ব্যবহারের পাশাপাশি স্থানীয় সক্ষমতা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। কেউ কেউ মনে করেন, বর্তমান জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় দ্রুত পদক্ষেপ হিসেবে স্পিরিটের পরিবর্তে ইথানল উৎপাদন করে তা প্রচলিত জ্বালানির সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা যেতে পারে। এছাড়া সার উৎপাদন নিরবচ্ছিন্ন রাখতে ভোলা থেকে গ্যাস সিএনজি বা মাইক্রো-এলএনজি আকারে সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এলপিজিকে সিন্থেটিক ন্যাচারাল গ্যাস হিসেবে সার কারখানায় ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন সচল রাখার পরামর্শও দিয়েছেন উদ্যোক্তারা।

শিল্পোদ্যোক্তা ও ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য সংকটে বাংলাদেশে অগ্রিম প্রস্তুতির ক্ষেত্রে জ্বালানি সংগ্রহে সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিতে হবে। কারণ অর্থনীতির সব খাতে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সরকার বিকল্প উৎসগুলো থেকে জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা করছে, এটা ভালো উদ্যোগ। তবে এ উৎস আরো বাড়াতে হবে। হয়তো পেমেন্ট বেশি লাগবে। কিন্তু অর্থনীতি ঠিক রাখতে এটা করতে হবে। পৃথিবীর ২০ শতাংশ জ্বালানি হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ৯০ শতাংশ জ্বালানি মধ্যপ্রাচ্যকে ঘিরে। ফলে অগ্রিম প্রস্তুতির ক্ষেত্রে জ্বালানি সরবরাহ ঠিক রাখা গেলে অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে বাকি পদক্ষেপগুলোও সহজ হবে।’

বর্তমান বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং খাদ্য মজুদ জোরদারের ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন দেশের শীর্ষ শিল্পোদ্যোক্তারা। সহনীয় মূল্যস্ফীতির কৌশলের ক্ষেত্রে তারা বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণের কথা বলছেন। তারা মনে করেন, বর্তমানে ‘আনম্যানেজেবল’ বা অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতির চেয়ে পরিকল্পিতভাবে জ্বালানি ও ভোজ্যতেলের দাম বাড়িয়ে একটি ‘ম্যানেজড ইনফ্লাশন’ ইকোনমি প্রবর্তন করা শ্রেয়। এতে আকস্মিক বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হবে। জনগণকে আগে থেকেই সচেতন করতে হবে যে পরিস্থিতি মোকাবেলায় মূল্যবৃদ্ধির চাপ মেনে নিতে হবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে দূরদর্শী পরিকল্পনা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি উল্লেখ করে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের মূল বিষয় জ্বালানি। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই হবে। এলপিজির দাম টনপ্রতি প্রায় ৪০০ ডলার বেড়েছে। এ ধরনের মূল্যস্ফীতি কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তা ভাবতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের প্রেক্ষাপটে এলএনজি, এলপিজি ও ক্রুড অয়েলের সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।’

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নেয়ার সময় সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব বিবেচনায় বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। মোস্তফা কামালের মতে, মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব নয়, তবে এর প্রভাব কমাতে ভারসাম্যপূর্ণ নীতি প্রয়োজন। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘স্থির আয়ের মানুষের আয় না বাড়লে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকলে ভোগ কমে যাবে, স্বাস্থ্য ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং সামগ্রিকভাবে জীবনযাত্রার মান ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

খাদ্যনিরাপত্তা প্রসঙ্গে মোস্তফা কামাল বলেন, ‘বিশ্বে উন্নত, এমনকি বেশকিছু উন্নয়নশীল দেশেও সংকট মোকাবেলার জন্য প্রস্তুতিমূলক অবকাঠামো থাকে। ওইসব দেশে দেখা গেছে দুর্যোগ পরিস্থিতিতে ফুয়েল সংকট হলে সরকার তার মজুদ থেকে বাজারে সরবরাহ করে। খাদ্য সংকট হলে সরকার তার মজুদ থেকে বাজারে সরবরাহ করে। বাজারকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। কিন্তু বাংলাদেশে সর্বোচ্চ ১৫ দিনের জ্বালানি তেল মজুদ থাকে, উন্নত দেশে থাকে ছয় মাস থেকে এক বছরের। এ ধরনের পদক্ষেপগুলো নিতে আমাদের অবকাঠামো উন্নয়নসহ সামগ্রিকভাবেই দূরদর্শী হতে হবে।’

খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে রিজার্ভের একাংশ খাদ্য মজুদে রূপান্তরের পরামর্শও এসেছে উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে। তারা বলছেন, বৈশ্বিক খাদ্য সংকটের আশঙ্কা থেকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের একটি অংশ দিয়ে জরুরি ভিত্তিতে খাদ্য আমদানি করা যেতে পারে। বছরে ৩০ থেকে ৬০ লাখ টন চাল আমদানির অভিজ্ঞতার আলোকে, সরকারি মজুদ ৭০-৮০ লাখ টনে উন্নীত করে ‘ফুড স্টক পাইল’ তৈরির ওপর জোর দেয়া সম্ভব, যা সংকটের সময় বাফার হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।

উদ্যোক্তারা আরো বলছেন, পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার অভাবে খাদ্য আমদানি কঠিন হয়ে যেতে পারে। তাই কৃষি খাতে নির্ভরতা বাড়িয়ে সার ও জ্বালানির সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় ও রফতানিমুখী শিল্পে জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখা জরুরি। তারা বলছেন, খাদ্যনিরাপত্তা, স্থানীয় শিল্প ও রফতানিমুখী শিল্প—এ তিন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা দেশের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে উৎপাদন ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সিকম গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ডেল্টা এগ্রো ফুড ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এখন একটি সংকটময় মুহূর্ত বিরাজ করছে। আগামীকাল কী হবে আমরা জানি না। আমাদের এখন স্বল্পমেয়াদে কী করা লাগবে, তা নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে।’

যেকোনো পণ্যের দামের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক সমন্বয় জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ভর্তুকির বিষয়ে সতর্ক হতে হবে। সরকার কতদিন ভর্তুকি দেবে? যত দেবে ততই অর্থনীতি প্যারালাইজড হবে। অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধিতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। করজাল বাড়াতে হবে। সরকার তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। বেসরকারি খাতকেও সরকারকে উৎসাহ দিতে হবে শক্তভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য।’

অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বৃদ্ধিতে ভ্যাট আদায়ে খাতভিত্তিক তদারকির কথা বলছেন উদ্যোক্তারা। অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণে তারা ভ্যাট প্রশাসনে আমূল পরিবর্তনের প্রস্তাব দিচ্ছেন। তারা জানিয়েছেন, দেশের মোট ব্যবসার ৮০ শতাংশই নিয়ন্ত্রণ করে ২০ শতাংশ বড় কোম্পানি। স্টিল, সিরামিক, সিমেন্ট, প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়ামসহ ৫০টি গুরুত্বপূর্ণ খাত চিহ্নিত করে সেই বড় কোম্পানিগুলোর ওপর ‘কন্টিনিউয়াস রিকনসিলিয়েশন’ বা নিবিড় তদারকি চালালে রাজস্ব আহরণ বহুগুণ বাড়বে। এতে সাধারণ ব্যবসায়ীদের হয়রানি কমবে এবং রাজস্বে শৃঙ্খলা ফিরবে।

বর্তমান বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে সামনে দীর্ঘমেয়াদি সংকটের আশঙ্কা প্রকাশ করে তা মোকাবেলায় সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘প্রথমেই সামনে থাকা বড় চ্যালেঞ্জটি স্বীকার করতে হবে। এ সংকট স্বল্পমেয়াদি নয়, বরং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এটি দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক জোনের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হওয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠছে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট খাতগুলোর সমন্বয়ে সরকারের একটি সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া জরুরি।’

ব্যাংক ও জ্বালানি খাতের সংকটে গত কয়েক বছরে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শ্লথ হয়ে গেছে উল্লেখ করে এ ব্যবসায়ী নেতা বলেন, ‘এতে বেকারত্ব বেড়েছে এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির প্রভাব দেশের ওপরও পড়ছে। জ্বালানির ব্যয় বাড়ায় সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হচ্ছে। রফতানি আয়ে ধাক্কা খাচ্ছে বাংলাদেশ। ফলে ডলার সরবরাহ কমে গেলে জ্বালানি তেল ও কাঁচামাল আমদানি ব্যাহত হতে পারে।’ এ অবস্থায় বর্তমান ডলার প্রবাহের ওপর ভিত্তি করেই বাজেট ও নীতিনির্ধারণের আহ্বান জানান তিনি।

সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর সমন্বয় প্রয়োজন বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা। তারা বলছেন, বর্তমানে দেশে ৪২-৪৩ ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু রয়েছে। এগুলোকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় এনে বিতরণ ব্যবস্থা আরো দক্ষ করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। কৃষি কার্ড বা ডিজিটাল ডেটাবেজের মাধ্যমে ২০ শতাংশ অতিদরিদ্র মানুষকে জেন্ডার ও ডেমোগ্রাফি অনুযায়ী শ্রেণীবদ্ধ করে সরাসরি সহায়তা দিলে সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা সহজ হবে।

আর্থিক খাতে নৈতিকতা ও সংস্কার বিষয়ে উদ্যোক্তারা বলছেন, ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ বা ব্যবসায়ীদের ঢালাও দায়মুক্তি দেয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করে বিনিয়োগমুখী পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। কর ফাঁকি ও অব্যাহতি বন্ধ করে একটি ‘ন্যায়ভিত্তিক মুদ্রা ব্যবস্থা’ তৈরির মাধ্যমে অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনা সম্ভব।

শিল্প খাত সচল রাখতে কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ তহবিল গঠন বা অতিরিক্ত অর্থায়নের প্রয়োজন হতে পারে বলে ধারণা করছেন মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান তানভিরুর রহমান। উচ্চ সুদহার বর্তমান পরিস্থিতিতে শিল্পের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেও বলে তিনি উল্লেখ করেন। বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে আগাম ও প্রো-অ্যাক্টিভ পদক্ষেপ নেয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করে এ ব্যবসায়ী নেতা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যেকোনো পদক্ষেপ নেয়ার আগে সরকারকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে কী ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে। এরপর চূড়ান্তভাবে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। জ্বালানির দাম এরই মধ্যে বৈশ্বিক বাজারে বেড়েছে এবং এর প্রভাব দেশীয় বাজারেও পড়বে। এ বিষয়ে শিগগিরই একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। তবে মূল্য সমন্বয় কতটা এবং কীভাবে করা হবে তা নির্ধারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

সতর্ক করে দিয়ে কামরান তানভিরুর রহমান বলেন, জ্বালানির দাম বাড়লে অনেক শিল্প-কারখানার উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে, যা তাদের টিকে থাকা কঠিন করে তুলতে পারে। এ পরিস্থিতিতে তিনি জ্বালানি খাতে আরোপিত কর ও শুল্ক কমানোর বিষয়টি বিবেচনায় আনার পরামর্শ দেন। বিশ্বের অনেক দেশ এরই মধ্যে তেলের ওপর কর কমিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করছে বলেও তিনি জানান।

রফতানিমুখী শিল্পের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, উৎপাদন ব্যয় বাড়লে সেই অতিরিক্ত খরচ আন্তর্জাতিক বাজারে স্থানান্তর করা সম্ভব হবে কিনা তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে, যা দেশের রফতানি খাতকে চাপে ফেলতে পারে। বিশ্বের পাশাপাশি দেশীয় অর্থনীতিতেও নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে পারে, সেগুলো কার্যকর করতে ব্যবসায়ী মহলের সঙ্গে নিয়মিত সম্পৃক্ততা বজায় রাখা জরুরি।’

জ্বালানি বা খাদ্যের আন্তর্জাতিক প্রকিউরমেন্টের ক্ষেত্রে একক উৎসের ওপর নির্ভর না করে বৈচিত্র্যকরণের পরামর্শ দিয়েছেন শিল্পোদ্যোক্তরা। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জ্বালানি ও খাদ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে উৎস বৈচিত্র্য নিশ্চিত করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলোকে আরো সক্রিয় করতে হবে। নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করে এসব মিশনের মাধ্যমে নতুন সরবরাহ উৎস খুঁজে বের করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে আসন্ন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আগাম সতর্কতা ও জনসম্পৃক্ততার ওপর জোর দেন উদ্যোক্তারা। তারা বলেন, পরিস্থিতির বাস্তবতা সম্পর্কে জনগণকে আগে থেকেই অবহিত করতে হবে এবং নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেয়া প্রয়োজন। কৃচ্ছ্রসাধনের পথে হাঁটার জন্য সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করারও আহ্বান জানানো হয়েছে। এ ধরনের বহুমুখী উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলে মধ্যপ্রাচ্যের সংকটজনিত নেতিবাচক প্রভাব থেকে দেশের অর্থনীতিকে সুরক্ষা দেয়া সম্ভব হবে বলে তারা মনে করেন।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা সরকারের কাছে যেটা প্রত্যাশা করি, সেটা মূলত জ্বালানি নিরাপত্তা। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে এখন জ্বালানি অনিশ্চয়তা আরো বেড়েছে। এটি সুরক্ষিত করার জন্য সরকারকে জ্বালানি আমদানির উৎসে বৈচিত্র্য আনতে হবে এবং অবশ্যই এটি যেন স্থায়ীভাবে করা হয়। প্রাথমিকভাবে ঝুঁকি কমানোর জন্য আমদানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা প্রয়োজন। আমদানিনির্ভরতা যতদিন থাকে, ততদিন এ বিষয়টিতে জোর দিতে হবে।’

দীর্ঘমেয়াদে স্থানীয় জ্বালানি সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রত্যাশা জানিয়ে মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘ভোলার গ্যাস কীভাবে মেইনস্ট্রিমে আনা যায়, সে সিদ্ধান্তটি দ্রুত নেয়া প্রয়োজন। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুতের যে চুক্তিগুলো বাতিল করা হয়েছিল, সেগুলো সম্ভব হলে রি-নেগোশিয়েট করে যেন ঠিক করা হয়। কারণ সরকারের যেকোনো চুক্তি করতে গেলে তা নিরাপদ বা টেকসই হবে না—এ ধরনের একটি ভুল বার্তা বিদেশী এবং স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের কাছে গেছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে বাজেটে আমাদের প্রস্তাবিত বিষয়গুলো যেন গ্রহণ করা হয়, সে প্রত্যাশাও রয়েছে।’

সুত্র:বণিক বার্তা