ইরান যুদ্ধ থেকে পিছু হটার ইঙ্গিত ট্রাম্পের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৮:২৮ এএম, বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২৬ | ১০৪

ইরান যুদ্ধ থেকে পিছু হটার ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল রয়টার্সকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র খুব দ্রুতই ইরান থেকে বেরিয়ে যাবে।’

তবে তিনি স্পষ্ট করেন, ‘প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র আবার ফিরে এসে সীমিত আকারে হামলা চালাবে।’ যাকে তিনি ‘স্পট হিট’ বলে উল্লেখ করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এমন পদক্ষেপ মূলত ইরান যুদ্ধ থেকে সরে আসারই ইঙ্গিত। এটি ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কৌশলের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে তিনি বড় ধরনের সামরিক বা রাজনৈতিক অভিযান শুরু করলেও স্পষ্ট ও টেকসই ফলাফল নিশ্চিত না করেই সরে আসেন। সমালোচকরা ট্রাম্পের এ প্রবণতাকে প্রায়ই ‘চিকেন আউট’ বলে আখ্যা দেন।

ইরান যুদ্ধ থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিয়েছে ইসরায়েলও। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহু এক ভিডিও বার্তায় বলেছেন, ‘ইরান ও তাদের সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ইসরায়েলকে হুমকি দেয়ার সীমিত ক্ষমতা থাকলেও তারা আর ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি নয়।’ তবে বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প যুদ্ধ থেকে ফিরে এলেও ইউরোপকে মূল্য দিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রও নিজেকে এর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে পারবে না। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের প্রভাব আরো শক্তিশালী হবে।

রয়টার্সকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের ফলে ইরান আর পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে সক্ষম নয়। তিনি বলেন, ‘তারা এখন আর পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে না। আমরা বেরিয়ে যাব, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে যাব। তবে প্রয়োজন হলে আবার ফিরে এসে নির্দিষ্ট হামলা চালাব।’ ট্রাম্প আরো জানান, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বিমান হামলায় নিহত হওয়ার পর দেশটিতে কার্যত শাসন পরিবর্তন হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা পূর্ণমাত্রার শাসন পরিবর্তন পেয়েছি। এখন নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে একটি চুক্তির ভালো সম্ভাবনা রয়েছে, কারণ তারা আর হামলার শিকার হতে চায় না।’

তিনি স্বীকার করেন, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য সরাসরি শাসন পরিবর্তন ছিল না, তবে যুদ্ধের পরিস্থিতির কারণে সেটি ঘটেছে। তার ভাষায়, ‘আমাদের শাসন পরিবর্তন দরকার ছিল না, কিন্তু যুদ্ধের কারণে সেটি হয়েছে। এখন সবচেয়ে বড় বিষয় হলো তারা পারমাণবিক অস্ত্র পাবে না।’

ইরানের হাতে থাকা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, ‘ওগুলো মাটির এত গভীরে যে আমি তা নিয়ে ভাবছি না। আমরা স্যাটেলাইট দিয়ে সবসময় নজর রাখব।’ একই সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ন্যাটো জোট থেকে বেরিয়ে আসার ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেন, ‘যখন আমাদের প্রয়োজন ছিল, তারা আমাদের বন্ধু ছিল না। আমরা তাদের কাছে খুব বেশি কিছু চাইনি, কিন্তু এটি একমুখী সম্পর্ক।’ তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রকে ন্যাটো থেকে প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনা করছেন।

এদিকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ইরান ও তাদের সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ইসরায়েলকে হুমকি দেয়ার সীমিত ক্ষমতা থাকলেও তারা আর ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য কোনো বড় হুমকি নয়। মঙ্গলবার রাতে দেয়া এক ভিডিও ভাষণে তিনি এ মন্তব্য করেন। নেতানিয়াহু বলেন, ‘অতীতে ইসরায়েল একাই ইরানের বিরুদ্ধে লড়াই করত, তবে এখন আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়ছি।’ ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী আরো জানান, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের হুমকি মোকাবেলার জন্য ইসরায়েল এ অঞ্চলের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশের সঙ্গে নতুন একটি জোট গঠন করছে। তবে এ বিষয়ে তিনি এখনই বিস্তারিত কোনো তথ্য দেননি।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের মধ্যে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে সরাসরি বার্তা পাওয়ার কথা নিশ্চিত করেছে ইরান। তবে তেহরান স্পষ্ট জানিয়েছে, বার্তা আদান-প্রদান হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক আলোচনা বা সমঝোতার প্রক্রিয়া চলছে না। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিভাষায় আলোচনার একটি নির্দিষ্ট সংজ্ঞা রয়েছে। আলোচনা বলতে এমন এক পরিস্থিতিকে বোঝায়, যেখানে দুই দেশ চুক্তিতে পৌঁছার জন্য একসঙ্গে বসে কথা বলে। বর্তমানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এমন কোনো পরিস্থিতি নেই। সংঘাতে জড়িত দেশগুলো মাঝেমধ্যে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বার্তা আদান-প্রদান করে। কিন্তু একে আলোচনা বলা যায় না।’

তবে আরাগচি স্বীকার করেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কিছু বার্তা সরাসরি এবং কিছু আঞ্চলিক বন্ধুদের মাধ্যমে পাচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী ইরান সেগুলোর জবাবও দিচ্ছে। আরাগচি বলেন, ‘ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ অতীতের মতো তাকে সরাসরি বার্তা পাঠানো অব্যাহত রেখেছেন। কিন্তু এটিকে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা বলা যায় না।’

এদিকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় এ পর্যন্ত ১ লাখ ১৫ হাজারেরও বেশি বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। গতকাল ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি হালনাগাদে এ তথ্য জানিয়েছে। টেলিগ্রাফে দেয়া এক পোস্টে ইরানের রেড ক্রিসেন্ট জানায়, ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হওয়া অবকাঠামোর মধ্যে আবাসিক ভবন, চিকিৎসা কেন্দ্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ত্রাণ কেন্দ্রসহ নানা ধরনের বেসামরিক স্থাপনা রয়েছে।

অন্যদিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, ইরান ও তার মিত্র ‘প্রতিরোধ ফ্রন্ট’ শেষ দফার হামলায় ১০০টিরও বেশি ভারী ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করেছে। পাশাপাশি অন্তত ২০০টি রকেট ছুড়েছে। আইআরজিসির তথ্যমতে, এসব হামলায় ইসরায়েলের বিভিন্ন স্থান এবং পারস্য উপসাগরে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এর মধ্যে বাহরাইনে মার্কিন বাহিনীর একটি ঘাঁটি এবং কুয়েতের আল-আদিরি ঘাঁটিতে একটি মার্কিন হেলিকপ্টার ইউনিট রয়েছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে আইআরজিসি। এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মী ও আশপাশে বসবাসকারী সাধারণ মানুষকে দ্রুত এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে বাহিনীটি। আইআরজিসির বিবৃতির বরাত দিয়ে ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ ও নজরদারির মূল কারিগর হলো যুক্তরাষ্ট্রের আইসিটি ও এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) কোম্পানিগুলো। তাই এখন থেকে এ প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে গণ্য হবে।

এদিকে গতকালও ইরানে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। হামলার ঘটনা ঘটেছে উপসাগরীয় অন্যান্য দেশেও। গতকাল কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় তেলবাহী একটি জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর নিশ্চিত করেছে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জাহাজে থাকা ২১ জন ক্রুকে কোনো আঘাত ছাড়াই নিরাপদে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় জানায়, ইরান থেকে কাতার লক্ষ্য করে তিনটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। কাতারের সশস্ত্র বাহিনী দুটি ক্ষেপণাস্ত্র মাঝপথে ধ্বংস করে দেয়। তবে তৃতীয়টি ‘কাতার এনার্জি’র ভাড়া করা একটি তেলবাহী জাহাজে আঘাত হানে।

কুয়েতের সরকারি সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, দেশটির আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ড্রোন হামলায় বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। কুয়েতের বেসামরিক উড়োজাহাজ চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গতকাল বিমানবন্দরটি ইরানি ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে। ফলে জ্বালানি ট্যাংকে ভয়াবহ আগুন ধরে গেছে। কুয়েত নিউজ এজেন্সির (কুনা) প্রতিবেদনে বেসামরিক উড়োজাহাজ চলাচল কর্তৃপক্ষের মুখপাত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, বিমানবন্দরটি ইরান ও দেশটির সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর চালানো হামলার শিকার হয়েছে।

এদিকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল মানদেব প্রণালি পুরোপুরি বন্ধের হুমকি দিয়েছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা। তারা বর্তমানে দক্ষিণ ইসরায়েল লক্ষ্য করে হামলা আরো জোরদার করেছে। হুথি কর্মকর্তারা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তাদের দাবি পূরণ হলেই শুধু হামলা বন্ধ করবেন তারা। তাদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে ইসরায়েলের গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তি মেনে চলা ও ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে ইসরায়েলের অংশ না নেয়া। হুথিদের প্রভাবশালী নেতা মোহাম্মদ আল-বুখাইতি জানিয়েছেন, সামরিক সংঘাত আরো বাড়ানোর জন্য তাদের সামনে আরো অনেক বিকল্প ও ধাপ রয়েছে। তার মতে, এর মধ্যে অন্যতম একটি বিকল্প হতে পারে বাব আল মানদেব প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া।