ইসরায়েলি হামলা ও আরো মার্কিন সেনা মোতায়েনে চাপে পাকিস্তানের শান্তি উদ্যোগ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৭:১৯ পিএম, রোববার, ২৯ মার্চ ২০২৬ | ৬৫

ইরানে ইসরায়েলের বেসামরিক স্থাপনায় বাড়তে থাকা বোমা হামলা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের দ্রুত সামরিক শক্তি বৃদ্ধি পাকিস্তানের শান্তি উদ্যোগকে কঠিন চাপে ফেলছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সম্ভাব্য আলোচনার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চাইলেও পরিস্থিতির অবনতি সেই প্রচেষ্টাকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

পাকিস্তান তুলনামূলক নিরপেক্ষ অবস্থান কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা আয়োজনের চেষ্টা করছে। দেশটির সঙ্গে দুই পক্ষেরই কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে সরাসরি কোনো সামরিক জোট বা মার্কিন ঘাঁটি না থাকায় ইসলামাবাদকে সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেখা হচ্ছে। সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এবং সাম্প্রতিক সময়ে তেহরানের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতিও এই প্রচেষ্টাকে জোরদার করেছে।

পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের মতে, নীতিগতভাবে দুই পক্ষই আলোচনায় আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে সংঘাত দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে, পারস্পরিক অবিশ্বাস বাড়ছে এবং ওয়াশিংটন ও তেহরানের অবস্থানের মধ্যে ব্যবধান এখনও অনেক। তাদের আশঙ্কা, আলোচনার সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে উঠতে পারে ইসরায়েল।

শুক্রবার ইসরায়েল ইরানের দুটি বৃহৎ ইস্পাত কারখানা এবং বেসামরিক পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, এ হামলা মার্কিন প্রেসিডেন্টের বেসামরিক অবকাঠামোয় আঘাত স্থগিত রাখার ঘোষণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তেহরান আরো দাবি করেছে, দুটি বিশ্ববিদ্যালয়েও হামলা হয়েছে। পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের মতে, এ ধরনের বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আক্রমণ সম্ভাব্য আলোচনাকে ভেঙে দিতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রে সাবেক পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত মালিহা লোধি বলেন, ইরানের প্রধান উদ্বেগ হলো যুদ্ধের অবসান এবং ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের কোনো হামলা না হওয়ার নিশ্চয়তা। তার ভাষায়, ‘সবচেয়ে কঠিন বিষয় হলো ট্রাম্পের কথায় আস্থা রাখা। তিনি যুক্তিনির্ভর নন, বরং অপ্রত্যাশিত আচরণ করেন।’

সম্ভাব্য সমাধানের একটি প্রস্তাব হিসেবে হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও প্রত্যাখ্যান করেছেন। অন্যদিকে ট্রাম্প যৌথভাবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান প্রশাসনের ধারণাও উত্থাপন করেছেন। এ পর্যন্ত পাকিস্তান দুই পক্ষের মধ্যে প্রস্তাব আদান-প্রদান করছে, যদিও উভয় পক্ষই কঠোর অবস্থানে রয়েছে। তবু ইসলামাবাদ মনে করে, আন্তরিকতা থাকলে সমঝোতার পথ তৈরি হতে পারে।

শনিবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ f ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। পাশাপাশি তুরস্ক, মিশর, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে ইসলামাবাদে বৈঠকের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যেখানে যুদ্ধ বন্ধের উপায় নিয়ে আলোচনা হবে। এ চার দেশ মুসলিম বিশ্বের নতুন একটি কূটনৈতিক সমন্বয় হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।

পাকিস্তান আশা করছে, সম্ভাব্য আলোচনা হবে পরোক্ষভাবে—যেখানে দুই পক্ষ পৃথক কক্ষে অবস্থান করবে এবং পাকিস্তানি কর্মকর্তারা মধ্যস্থতা করবেন। তেহরান সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বসতে অনিচ্ছুক।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি পরিস্থিতিকে আরো জটিল করছে। মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইতোমধ্যে প্রায় ৭ হাজার সেনা মধ্যপ্রাচ্যের পথে রয়েছে এবং পেন্টাগন আরো ১০ হাজার সেনা পাঠানোর কথা বিবেচনা করছে।

সব মিলিয়ে, ইসরায়েলের অব্যাহত হামলা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়তে থাকায় পাকিস্তানের শান্তি উদ্যোগ ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। পরিস্থিতি যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে আলোচনার সম্ভাবনা টিকে থাকলেও তা বাস্তবে রূপ নেওয়া এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।