টাঙ্গাইলের সংসদীয় আট আসন

উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের কাছে টানতে ব্যস্ত হেভিওয়েট প্রার্থীরা

আলোকিতপ্রজন্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:৩৭ পিএম, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬ | ৮০
ছবি-বণিক বার্তা

রাজধানী ঢাকার নিকটবর্তী জেলা টাঙ্গাইলে সংসদীয় আসন আটটি। মোট ভোটার ৩৩ লাখ ৩৪ হাজার ৪২৭ জন। এর মধ্যে নারী ১৬ লাখ ৬২ হাজার ৭৭২ ও পুরুষ ১৬ লাখ ৭১ হাজার ৬৩০ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ২৫ জন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে এরই মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলো প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে কয়েকটি আসনে রয়েছেন বেশ কয়েকজন হেভিওয়েট প্রার্থী। প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই গণসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। অবশ্য প্রচারণায় পিছিয়ে নেই অন্য প্রার্থীরাও। পথসভা, উঠান বৈঠক এবং ঘরে ঘরে ভোটারদের সঙ্গে মতবিনিময় সভাও করছেন। উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে কাছে টানার চেষ্টা করছেন ভোটারদের।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য বলছে, আটটি আসনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্রসহ ৬৫ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। যাচাই-বাছাই শেষে ২৮ জনের প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে। তাদের মধ্যে আপিলে ১৮ জন প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। শেষ দিনের শুনানিতে ১৮ জানুয়ারি প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন তিনজন। সব মিলিয়ে ভোটের মাঠে রয়েছেন ৫৫ প্রার্থী।

আসনভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মধুপুর ও ধনবাড়ী উপজেলা নিয়ে গঠিত টাঙ্গাইল-১ আসন। ১৯৭৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামী লীগ আটবার, বিএনপি দুবার, জাসদ ও জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রার্থী একবার করে নির্বাচিত হয়েছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ফকির মাহবুব আনাম স্বপন। এছাড়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মুহাম্মদ আব্দুল্লাহেল কাফী, জাতীয় পার্টির মুহাম্মদ ইলিয়াছ হোসেনও রয়েছেন ভোটের মাঠে। প্রথমে মনোনয়নপত্র বাতিল হলেও আপিলে বৈধতা পেয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ আলী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী হারুন অর রশিদ।

গোপালপুর ও ভূঞাপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত টাঙ্গাইল-২ আসনে বিগত নির্বাচনগুলোয় আওয়ামী লীগ ছয়বার, বিএনপি চারবার, জাসদ ও জাপার প্রার্থী একবার করে নির্বাচিত হয়েছেন। সর্বশেষ দুবারের সংসদ সদস্য তানভীর হাসান ছোটমনির শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর ভারতে চলে গেছেন। আসনটিতে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন দলের কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম পিন্টু। তিনি ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলায় দীর্ঘ ১৭ বছর কারাভোগ শেষ গত বছর খালাস পান। একক প্রার্থী হিসেবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর টাঙ্গাইল জেলা শাখার সেক্রেটারি মাওলানা হুমায়ুন কবির, গণঅধিকার পরিষদের দপ্তর সম্পাদক শাকিল উজ্জামান, জাতীয় পার্টির মো. হুমায়ুন কবীর তালুকদারও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। এছাড়া আপিল করে আরারো ভোটে ফিরেছেন ইসলামী আন্দোলনের মনোয়ার হোসেন সাগর।

সমতল আর পাহাড়বেষ্টিত টাঙ্গাইল-৩। একটি পৌরসভা ও ১৪টি ইউনিয়ন নিয়ে এ আসন গঠিত। বিগত নির্বাচনগুলোতে আওয়ামী লীগ পাঁচবার, বিএনপি পাঁচবার, জাপা ও স্বতন্ত্র প্রার্থী একবার করে নির্বাচিত হয়েছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এসএম ওবায়দুল হক নাসির। অবশ্য স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন দলটির আরেক নেতা লুৎফর রহমান খান আজাদ। এছাড়া এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হোসনী মোবারক বাবুল, এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সাইফুল্লাহ হায়দার, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী হাফেজ মাওলানা রেজাউল করিম। আপিল করে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন আইনিন নাহার। তিনিও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন অন্য প্রার্থীদের সঙ্গে।

মুক্তিযুদ্ধের সুতিকাগারখ্যাত টাঙ্গাইল-৪ আসনে একটি মাত্র উপজেলা; কালিহাতী। দুটি পৌরসভা ও ১৩টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এ আসনে বিগত নির্বাচনগুলোতে আওয়ামী লীগ পাঁচবার, জাসদ তিনবার, বিএনপি দুবার এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী দুবার জয়লাভ করেছেন। এবারের নির্বাচনে আসনটিতে লড়বেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য লুৎফর রহমান মতিন, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী প্রফেসর খন্দকার আব্দুর রাজ্জাক। প্রথমে মনোনয়নপত্র বাতিল হলেও আপিলে ভোটের মাঠে ফিরেছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী আলী আমজাদ হোসেন ও স্বতন্ত্র প্রার্থী আব্দুল হালিম মিঞা।

স্বতন্ত্র প্রার্থী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নির্বাচনী এলাকা নিয়ে আমার কিছু উন্নয়ন পরিকল্পনা রয়েছে। আশা করব নির্বাচনে একটা উৎসব হবে, যা ইতিহাসে আজ পর্যন্ত হয়নি। তবে আমি সেই উৎসবের আমেজ দেখতে পাচ্ছি না। ভীতির আমেজ দেখছি।’

নানা কারণে গুরুত্ব বহন করে টাঙ্গাইল-৫ (সদর) আসনটি। শিক্ষানগরীখ্যাত আসনটিতে রয়েছে নদীর তীরবর্তী চরাঞ্চল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন দলের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ফরহাদ ইকবাল। এছাড়া ভোটের মাঠে রয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আহসান হাবিব মাসুদ ও জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক। প্রথম দিকে মনোনয়ন বাতিল হলেও আপিলে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন খেলাফত মজলিসের হাসানাত আল আমীন, গণসংহতি আন্দোলনের ফাতেমা আক্তার, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের খন্দকার জাকির হোসেন ও বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির হাসরত খান ভাসানী। ভোটের মাঠে তাদের রয়েছে সরব উপস্থিতি।

বিএনপি প্রার্থী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমার এলাকায় উন্নয়নের ক্ষেত্রে আমি সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নেব। ঢাকার পাশের এ জেলায় বিগত দিনে তেমন কোনো উন্নয়ন হয়নি। নির্বাচিত হলে যমুনা নদীর পাশ দিয়ে বেড়িবাঁধ নির্মাণ, মাহমুদ নগরে সেতু নির্মাণ, রাস্তাঘাট, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নেব। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ ও মাদক মুক্ত টাঙ্গাইল গড়ব।’

স্বতন্ত্র প্রার্থী ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ফরহাদ ইকবাল বলেন, ‘প্রথম পরিকল্পনা শহর ও গ্রামে উন্নয়নের সমতা আনা। দেখা যায় শহরে উন্নয়ন হচ্ছে, গ্রামে হচ্ছে না। কাজেই সেটা সমতায় ফিরিয়ে আনব। টাঙ্গাইল সদরে কয়েকটি ইউনিয়ন নিয়ে চরাঞ্চল রয়েছে। যমুনার ভাঙন রোধে স্থায়ী একটি বাঁধ নির্মাণ করা দরকার। টাঙ্গাইল শহরের সমস্যা নিরসন ও রাস্তাঘাটগুলো প্রশস্ত করার ব্যাপারে মনোনিবেশ করব।’

নাগরপুর ও দেলদুয়ার নিয়ে গঠিত টাঙ্গাইল-৬ আসন। এবার আসনটিতে বিএনপির একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকলেও দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন যুবদলের সাবেক সহসভাপতি রবিউল আওয়াল লাভলু। এছাড়া ভোটের মাঠে রয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. একেএম আব্দুল হামিদ, ইসলামী আঁখিনূর মিয়া, গণঅধিকার পরিষদের ইঞ্জিনিয়ার কবীর হোসেন, স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ আশরাফুল আলম, আতিকুর রহমান, জাতীয় পার্টির (জেপি) তারেক শামস খান ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। আপিলে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ মামুনুর রহিম, স্বতন্ত্র প্রার্থী জুয়েল সরকার ও শরীফুল ইসলাম।

নির্বাচিত হলে দুর্নীতি বন্ধসহ নির্বাচনী আসনে উন্নয়নমূলক কাজ করবেন বলে জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. একেএম আব্দুল হামিদ। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমার প্রথম কাজ হবে সব সেক্টর থেকে দুর্নীতি বন্ধ করা। দুর্নীতি বন্ধ হলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি প্রায় ৪০ শতাংশ কমে যাবে। এর সঙ্গে জনগণের সেবা দানকারী সব প্রতিষ্ঠান; যেমন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, স্কুল, কলেজ, ভূমি অফিস, থানার সেবার মান এখন যা আছে তার চেয়ে বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন নাগরপুর-দেলদুয়ার থেকেই উচ্চশিক্ষা, উন্নত চিকিৎসা এবং নিরাপদ জীবন যাপন করতে পারে সে পরিকল্পনা নেব।’

রাজধানী ঢাকার কাছাকাছি শিল্পাঞ্চলসমৃদ্ধ টাঙ্গাইল-৭ আসনে একটি মাত্র উপজেলা; মির্জাপুর। এছাড়া একটি পৌরসভা ও ১৪টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এ আসনে বিগত নির্বাচনগুলোতে আওয়ামী লীগ ছয়বার, বিএনপি চারবার, জাতীয় পার্টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী একবার নির্বাচিত হয়েছেন। এ আসন থেকে এবার নির্বাচনে লড়বেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও দলের কেন্দ্রীয় শিশুবিষয়ক সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী। এছাড়া জামায়াতের মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ এবনে আবুল হোসেন, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির মো. তোফাজ্জল হোসেনও রয়েছেন ভোটের মাঠে। অবশ্য আপিলে প্রার্থিতা ফিরে পেয়ে ভোটের মাঠে সরব হয়েছেন খেলাফত মজলিসের আবু তাহের ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের এটিএম রেজাউল করিম।

বাসাইল ও সখিপুর উপজেলা নিয়ে টাঙ্গাইল-৮ আসন। এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খান। তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন স্বতন্ত্র প্রার্থী ও লাবীব গ্রুপের চেয়ারম্যান সিআইপি সালাহ উদ্দিন আলমগীর রাসেল। এছাড়া ভোটের মাঠে রয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. শফিকুল ইসলাম খান, জাতীয় পার্টির নাজমুল হাসান, খেলাফত মজলিসের শহীদুল ইসলাম, আমজনতা দলের আলমগীর হোসেন ও বাংলাদেশ বিপ্লবী ওয়ার্কাস পার্টির প্রার্থী আওয়াল মাহমুদ।

সুত্র:বণিক বার্তা