ট্রাম্পের হামলার জবাবে ইরানের হাতে তিন অস্ত্র

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:৪০ পিএম, শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী ২০২৬ | ১০৪

দীর্ঘ অর্ধশতাব্দী ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান। মার্কিন সামরিক শক্তির সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা করতে না পারলেও তেহরান এমন সব কৌশল তৈরি করেছে, যা মধ্যপ্রাচ্য ছাড়িয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছানো যুক্তরাষ্ট্রের রণতরী ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য হামলার হুমকি ক্রমেই একটি বড়মাত্রার সংঘাতের আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত জুনে ইরানের ওপর ইরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং সাম্প্রতিক অভ্যন্তরীন অস্থিরতায় দেশটি বেশ আহত হলেও তাদের হাতে যথেষ্ট বিকল্প আছে। এর মধ্যে রয়েছে মার্কিন ও ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা, মিত্রদের সক্রিয় করা ও অর্থনৈতিক প্রতিশোধ। আর এ পদক্ষেপগুলো শুধু মধ্যপ্রাচ্যে নয়, বিশ্ব বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। তবে তেহরান কোন অস্ত্র বা কৌশল কীভাবে ব্যবহার করবে, তা নির্ভর করছে তাদের সামনে থাকা হুমকির মাত্রার ওপর।

ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের ইরান বিষয়ক নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক এবং সিনিয়র ফেলো ফারজিন নাদিমি বলেন, যদি ইরানের শাসকগোষ্ঠী এটিকে অস্তিত্বের প্রশ্ন হিসেবে দেখে, তাহলে তা মোকাবেলায় তাদের হাতে বিপুল সক্ষমতা রয়েছে। আর তারা যদি মনে করে এটি চূড়ান্ত যুদ্ধ, তাহলে নিজেদের সবকিছুই ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন

ইরানের কাছে রয়েছে হাজার হাজার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন, যা মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন ৩০-৪০ হাজার মার্কিন সেনার জন্য সরাসরি হুমকি। ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলের আকস্মিক হামলার প্রতিশোধ হিসেবে একের পর এক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছে ইরান। সে যুদ্ধের পর ব্যবহৃত অস্ত্রাগার আবারো পূরণ করে রাখার দাবি করছে সংশ্লিষ্টরা। মার্কিন কর্মকর্তারাও মনে করে, এ অস্ত্র এখনও হুমকি সৃষ্টি করতে সক্ষম।

উদাহরণস্বরূপ, ইরানের আত্মঘাতী ড্রোন 'শাহেদ' রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধেও ধ্বংসাত্মক ভূমিকা রেখেছে। এছাড়া ইরান ২০টিরও বেশি এ ধরনের সংক্ষিপ্ত, মধ্য ও দীর্ঘ-পরিসরের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে, যা দক্ষিণ ইউরোপ পর্যন্ত লক্ষ্যবস্তুকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। ইরানের এ সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রেরও জানা। এ প্রসঙ্গে দুই মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরানের সামরিক ক্ষমতা যদিও আধুনিক মার্কিন যন্ত্রের তুলনায় কম ও পুরনো, তবুও এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি।

ইরানের ওপর হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন মিত্রদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হুমকি দিয়ে আসছে তেহরান। গত জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন বোমারু বিমানের আঘাতের জবাবে কাতারের আল-উদেইদ এয়ার বেস লক্ষ্য করে প্রতিশোধমূলক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিল তারা।

প্রক্সি শক্তি সক্রিয় করা

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক হামলায় ইরানের আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক কিছুটা দুর্বল হলেও তারা এখনো বড় ধরণের হুমকি হয়ে আছে। কাতায়েব হিজবুল্লাহ ও হারাকাত আল-নুজাবার মতো গোষ্ঠীগুলো ইরানের সমর্থনে সরাসরি যুদ্ধে নামার ঘোষণা দিয়েছে।

লেবাননের হিজবুল্লাহ বর্তমানে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক চাপে দুর্বল হলেও ইয়েমেনের হুথিরা এখনো অত্যন্ত সক্রিয়। হুথিরা লোহিত সাগরে মার্কিন ও বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার মাধ্যমে ইতিমধ্যে তাদের সক্ষমতা দেখিয়েছে। কাতার ও ইরাকে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো এসব প্রক্সি গোষ্ঠীর প্রাথমিক লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।

অর্থনৈতিক প্রতিশোধ

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হলো বিশ্ব অর্থনীতিতে ধস নামানোর সক্ষমতা। বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেলের এক-পঞ্চমাংশ এবং বিপুল পরিমাণ এলএনজি হরমুজ প্রণালীর সরু জলপথ দিয়ে সরবরাহ করা হয়। ইরান এ প্রণালী বন্ধ করে দিলে তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে। আর এতে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরণের মন্দা দেখা দিতে পারে।

২০২৬ সালের বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এ পথে সামান্য অস্থিরতাও ব্যারেল প্রতি তেলের দাম ১৫-২৫ ডলার বাড়িয়ে দিতে পারে, যা বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতিকে আরো উসকে দেবে।

ইরান তাদের উপকূলরেখা বরাবর পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের গভীরে বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের দাবি অনুযায়ী, এসব ঘাঁটি মাটির প্রায় ৫০০ মিটার (১৬৫০ ফুট) গভীরে অবস্থিত। এটা এতটাই গভীর যে, যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক 'বাঙ্কার-বাস্টার' বোমা দিয়েও এগুলো ধ্বংস করা অত্যন্ত কঠিন। এসব ঘাঁটিতে কয়েকশ 'ফাস্ট অ্যাটাক এবং রাডার-ফাঁকি দিতে সক্ষম বিশেষ স্পিডবোট রাখা হয়েছে। এগুলো সুড়ঙ্গের মাধ্যমে সরাসরি সাগরের সঙ্গে যুক্ত।

ইরান তাদের নৌ-বাহিনীতে শহীদ বাঘেরি নামক ড্রোন ক্যারিয়ার যুক্ত করেছে। এটি মূলত একটি বড় বাণিজ্যিক জাহাজকে ড্রোনের রানওয়ে হিসেবে ব্যবহার করার প্রযুক্তি। এর মাধ্যমে ইরান উপকূল থেকে অনেক দূরে থেকেও সমুদ্রের জাহাজগুলোতে ড্রোন হামলা চালাতে সক্ষম।

ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের ইরান বিষয়ক নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক এবং সিনিয়র ফেলো ফারজিন নাদিমির মতে, পরবর্তী যুদ্ধ দাউনটাউন তেহরান থেকে নয়, বরং হরমুজ প্রণালী ও পারস্য উপসাগর থেকে শুরু হতে পারে।