টাঙ্গাইল শহরের বিভিন্ন দেয়ালে ঘুরে ঘুরে ছবি আঁকাই কাজ চানুঁ পাগলার

ছবি আঁকা যেন হয়ে গেছে তার জীবন সঙ্গী

হাসান সিকদার
প্রকাশিত: ০৪:০১ পিএম, সোমবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৩ | ২৬৭
নাম আবু বক্কর সিদ্দিক ওরফে চাঁনু মিয়া। চাঁনু পাগলা নামে পরিচিত। তার বয়স (৫১)। চাঁনু মিয়া ভারসাম্যহীন একজন মানুষ। বাবা মায়ের পাঁচ বোন এক ভাইয়ের মধ্যে সে সবার ছোট। ভোর হলে চাঁনু মিয়াকে আর পাওয়া যায় না তার বাড়িতে। নিজের ঘর তালা দিয়ে বের হন অজানা গন্তব্যে। যেদিকে মন চায় সেই দিকেই ছুটে বেড়ান তিনি। রাস্তায় ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন দেয়ালে আঁকাতে থাকেন নানা ধরণের ছবি। তার এ নিপুণ হাতে ছোঁয়ায় গড়ে তুলেন অসাধারণ ছবি। তার এ ছবি দেখে মুগ্ধ সব বয়সি মানুষ। আবার সন্ধ্যা হলে চলে যান তার নিজ বাড়িতে। এভাবেই কেটে যায় তার দিন-রাত। চাঁনু মিয়া পেশায় চিত্রশিল্পী না হলেও, একজন পেশাদার চিত্রশিল্পীকে পেছনে ফেলে দিবেন তিনি। মাত্র ১০-১৫ মিনিট সময়ের মধ্যে নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় ফুটিয়ে তুলেন সব রকমের ছবি। ছবিতে দেখা যায় একজন ছেলে আর একজন মেয়ে। অনেকেই বলেন ছেলেটি চাঁনু মিয়া, মেয়েটি তার প্রেমিকা। কিন্তু প্রেমিকার নামটি জানা যায়নি। প্রেমিকার ছবি ছাড়াও আঁকেন মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন ছবি। আবার বিভিন্ন দেয়ালে উপদেশ মূলক কথাও লেখে রেখেছেন। কিন্তু চাঁনু মিয়া ভালো করে কথা বলতে পারেন না। আবার যাও কথা বলেন তেমন বুঝা যায় না। অনেকেই বলছেন চাঁনু মিয়াকে সরকারি ভাবে সহযোগিতা করলে একজন পেশাদার চিত্রশিল্পী হতে পারবেন। 
 
জানা যায়, টাঙ্গাইল পৌর শহরের এনায়েতপুর এলাকার বাসিন্দা আবু বক্কর সিদ্দিক চাঁনু মিয়া। তিনি ছোট বেলা থেকে একজন স্বাভাবিক মানুষের মতো চলাচল করতো। পাঁচ বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে চাঁনু মিয়া সবার ছোট। পড়াশোনা করেছেন ১০ শ্রেণি পর্যন্ত। ছোট বেলায় পড়াশোনার পাশাপাশি বাবার সাথে মাঠে-ঘাটে কাজ করতেন। আর কাজের ফাঁকে সময় পেলে কচুরিপানা, মাটির টুকরা ও কয়লা দিয়ে আঁকতেন ছবি। সেখান থেকে শুরু হয় তার ছবি আঁকার যাত্রা। তার বাবা-মা মারা যাওয়ার পর মানসিকভাবে ভেঙে পরেন তিনি। তারপর থেকে চাঁনু মিয়া বিভিন্ন চিন্তা করতে করতে ভারসাম্যহীন হয়ে পরেন। এরপর ঘুরে ঘুরে শহরের বিভিন্ন দেয়ালে ছবি আঁকতে থাকেন। আর এ ছবি আঁকা যেন তার হয়ে গেছে জীবন সঙ্গী। 
 
গতকাল শুক্রবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চাঁনু মিয়ার সঙ্গে একটি বস্তা। বস্তার ভিতরে কয়লা ও কচুরিপানা আর কিছু কাগজের টুকরা পাশে রেখে পৌর শহরের পার্ক বাজারের মোড়ে একটি দেয়ালে চাঁনু মিয়া ছবি আঁকছেন। তার এ ছবি আঁকা দেখতে ভিড় করছেন নানা বয়সি মানুষজন। তার এ ছবি দেখে সবাই প্রশংসা করছেন। 
 
স্থানীয় রবিন সরকার বলেন, আমি ছোট বেলা থেকে দেখে আসছি চাঁনু মিয়া কচুরিপানা ও কয়লা দিয়ে শহরের বিভিন্ন দেয়ালে ছবি আর্ট করে রাখেন। তার ছবি আঁকা খুবই সুন্দর। তার এ ছবি আঁকা দেখে নতুন প্রজন্মের ছেলে মেয়েরা উৎসাহিত হবেন। তাকে সরকারিভাবে সহযোগিতা করলে আরও ভালো ছবি আঁকতে পারবেন। 
 
সোলায়মান হোসেন রাব্বি বলেন, আমি ছোট বেলা থেকে দেখতেছি তিনি বিভিন্ন দেয়ালে গাছের পাতা, কয়লা দিয়ে ছবি আঁকেন। বিভিন্ন দেয়ালে দেখা মিলে একটি ছেলে ও একটি মেয়ের ছবি সবাই ধারণা করছে মেয়েটি তার প্রেমিকা ছেলেটি সে। তার এ ছবি আঁকা দেখে অনেক ভালো লাগে। এছাড়াও তিনি স্বাধীনতার ছবি ও বঙ্গবন্ধুর ছবি আর্ট থাকেন। তাকে যদি সরকারি ভাবে সহযোগিতা করা হয় তাহলে তিনি আরও ভালো চিত্রশিল্পী হতে পারবেন। 
 
রিকশা চালক ইদ্রিস আলী বলেন, আমি শহরের বিভিন্ন এলাকা দিয়ে রিকশা চালায়। তখন চাঁনু পাগলাকে বিভিন্ন দেয়ালে ছবি আঁকতে দেখি। যখন যাত্রী না থাকে আমি রিকশা চালানো বন্ধ করে তার ছবি আঁকা দেখি অনেক ভালো লাগে। চাঁনু দেয়ালে দেয়ালে ছবি আঁকেন। যে দেয়ালে ছবি আঁকেন অনেক সময় তাকে বাসার মালিকরা গালিগালাচ করেন। তারপরও চাঁনু মিয়া থেমে জাননি। তার প্রতিভা দেখে সবাই মুগ্ধ। তাকে সরকারি ভাবে সহযোগিতা করলে আরও অনেক দূর যেতে পারবে। 
 
চাঁনু মিয়া ভারসাম্যহীন হওয়ায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। 
 
সাংস্কৃতিক কর্মী জসিম উদ্দিন বলেন, চাঁনু মিয়া অনেক সুন্দর ছবি আর্ট করতে পারেন। সে একজন ভারসাম্যহীন মানুষ তারপরও একজন পেশাদার চিত্রশিল্পীর মতো ছবি আর্ট করেন অনেক প্রশংসনীয়। আমি নিজেও মুগ্ধ তার এতো সুন্দর প্রতিভা দেখে। সরকারিভাবে যদি তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। আমার মনে হয় সে আরও ভালো ছবি আর্ট করতে পারবেন। তিনি টাঙ্গাইলের সুনাম অর্জন করতে পারবেন। 
 
টাঙ্গাইল জেলা কালচারাল অফিসার এরশাদ হাসান বলেন, আমি নিজেও দেখেছি চাঁনু মিয়া ভালো ছবি আঁকেন কেউ যদি চাঁনু মিয়ার দায়িত্ব নিয়ে শিল্পকলা একাডেমি বা জেলা প্রশাসক বরাবর আবেদন করেন। আমাদের যতটুকু সুযোগ আছে অবশ্যই চেষ্টা করবো তাকে সহযোগিতা করার।