বিশ্বকাপজুড়ে যেভাবে আতঙ্ক ছড়িয়েছেন মেসি
লিওনেল মেসি বল পায়ে এগিয়ে এলেই প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়ে। কেউ তার দিকে এগিয়ে যাবেন, নাকি পেছনে নেমে জায়গা বন্ধ করবেন—সে সিদ্ধান্ত নিতে নিতেই তৈরি হয় নতুন বিপদ। একজন তাকে আটকাতে গেলে পাশের খেলোয়াড় মুক্ত হয়ে যান, সবাই মিলে ঘিরতে গেলে খুলে যায় অন্য কোনো পথ। আর ভয় পেয়ে পুরো দল নিজেদের বক্সের কাছে গুটিয়ে গেলে মেসি পান বল ছোঁয়ার, মাথা তুলে দেখার এবং শেষ আঘাতটি হানার সুযোগ। ৩৯ বছর বয়সেও তাই মেসি শুধু গোল কিংবা অ্যাসিস্ট করছেন না; তার উপস্থিতিই বদলে দিচ্ছে প্রতিপক্ষের পরিকল্পনা।
২০২৬ বিশ্বকাপে মেসির পারফরম্যান্সকে বয়স কিংবা প্রচলিত ফুটবলীয় যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। আর্জেন্টিনার অধিনায়ক এখন পর্যন্ত আট গোল করেছেন, সঙ্গে চারটি অ্যাসিস্ট। অর্থাৎ দলের ১৯ গোলের ১২টিতেই তার প্রত্যক্ষ অবদান। ৩৪টি শট নিয়ে ১৮টি লক্ষ্যে রেখেছেন। ২৫টি গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন, সফল ড্রিবল করেছেন ২৪টি। গোলের সুযোগ তৈরি করা বলবহনও সবচেয়ে বেশি—১১টি। গোল, অ্যাসিস্ট, শট, লক্ষ্যে শট, সুযোগ সৃষ্টি, ড্রিবল, ক্রস, ফাউল আদায় কিংবা বল পুনরুদ্ধার—আর্জেন্টিনার প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ বিভাগেই শীর্ষে তিনি।
সংখ্যাগুলো মেসির প্রভাবের একটি অংশই শুধু তুলে ধরে। তার সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠেছে প্রতিপক্ষের মনে তৈরি হওয়া ভয়। মিসর ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেটিই দেখা গেছে। দুই দলই আর্জেন্টিনার বিপক্ষে এগিয়ে যাওয়ার পর ধীরে ধীরে নিজেদের রক্ষণসীমার ভেতর নেমে গিয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল জায়গা সংকুচিত করে মেসিকে আটকে রাখা। কিন্তু পরিকল্পনাটি শেষ পর্যন্ত উল্টো ফল দিয়েছে। মেসিকে বিপজ্জনক এলাকা থেকে দূরে রাখার পরিবর্তে তারা তাকে নিজেদের বক্সের আরো কাছে ডেকে এনেছে। সেখানে বল গ্রহণ, ড্রিবল, বল নিয়ে এগোনো, শেষ পাস কিংবা শট—প্রতিটি কাজেই মেসি বেশি ভয়ংকর।
মিসরের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে আর্জেন্টিনা একসময় ২-০ গোলে পিছিয়ে ছিল। ম্যাচ ও বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের শঙ্কা যখন ঘনীভূত, তখন মাঝের জায়গা ছেড়ে ডান প্রান্তে চলে যান মেসি। সেখান থেকে পুরো আক্রমণের দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেন। বিপজ্জনক সব ক্রস দিতে শুরু করেন, ড্রিবল করে প্রতিপক্ষের রক্ষণকে ভাঙতে থাকেন। তার ক্রস থেকেই ক্রিস্তিয়ান রোমেরোর গোলের পথ তৈরি হয়। এরপর আক্রমণের সূচনা করে নিজেই বক্সে ঢুকে সমতাসূচক গোল করেন। শেষ পর্যন্ত ৩-২ ব্যবধানে জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা।
সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষেও একই দৃশ্য ফিরে আসে। অ্যান্থনি গর্ডনের গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর ইংল্যান্ড ধীরে ধীরে পেছনে নামতে থাকে। গর্ডনকে তুলে নেওয়ার পর ৫৫ থেকে ৯০ মিনিট পর্যন্ত ইংল্যান্ডের বল দখল নেমে আসে মাত্র ১২ শতাংশে। মেসিকে জায়গা না দেয়ার চিন্তায় টমাস টুখেলের দল নিজেদের স্বাভাবিক আক্রমণাত্মক পরিকল্পনাই বিসর্জন দিয়েছিল। কিন্তু বক্সের সামনে জমাট হয়ে থেকেও তারা মেসিকে থামাতে পারেনি। বরং আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আরো বেশি বল পান, পুরো আক্রমণভাগে ঘুরে খেলেন এবং ভেতর ও বাইরে দুই পথেই সুযোগ তৈরি করেন।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১৪টি ড্রিবলের ১০টিতে সফল হন মেসি। নয়টি ক্রসের তিনটি সতীর্থের কাছে পৌঁছে দেন। তার প্রথম অ্যাসিস্ট থেকে এনজো ফার্নান্দেজ সমতা ফেরান। এরপর যোগ করা সময়ে একের বিপক্ষে এক পরিস্থিতিতে প্রতিপক্ষকে পেরিয়ে লাউতারো মার্তিনেজকে জয়সূচক গোলটি বানিয়ে দেন। ম্যাচের শেষদিকে তাঁকে আটকানোর বদলে ইংল্যান্ড যেন তার পরবর্তী চালের অপেক্ষায় ছিল। সেই আতঙ্কই মেসিকে আরো স্বাধীন করে দিয়েছিল।
আর্জেন্টিনা এ বিশ্বকাপে যে ১৯ গোল করেছে, তার ১২টিই এসেছে ৭৫ মিনিটের পর, যোগ করা সময়ে কিংবা অতিরিক্ত সময়ে। কেপ ভার্দের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে দুই গোল, মিসরের বিপক্ষে শেষভাগের নাটকীয় প্রত্যাবর্তন, সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে শেষদিকে ব্যবধান বাড়ানো এবং ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৮৫ ও ৯০ মিনিটের পর দুই গোল—সবই দেখিয়েছে, শেষ বাঁশি না বাজা পর্যন্ত এই দলকে থামানো যায় না। আর সেই শেষ সময়গুলোতেই মেসি হয়ে ওঠেন সবচেয়ে বিপজ্জনক।
ফাইনালে তাই স্পেনের পরিকল্পনার কেন্দ্রেও থাকবেন তিনি। লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল বল দখলে রেখে আক্রমণ করার সময় সাধারণত দুই সেন্টারব্যাকের সামনে রদ্রি ও দুই ফুলব্যাককে রেখে নিরাপত্তাবলয় তৈরি করে। বল হারানোর পর দ্রুত প্রতিপক্ষের পাল্টা আক্রমণ ঠেকানোই এর উদ্দেশ্য। তবে ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালে স্পেনের এই কাঠামোতেও কিছু ফাঁক দেখা গেছে। আক্রমণের সময় তাদের রক্ষণভাগের পেছনে কখনো কখনো ৫৩ মিটার পর্যন্ত খোলা জায়গা ছিল। একটি পরিস্থিতিতে পাউ কুবারসি ও আয়মেরিক লাপোর্তকে দুই আক্রমণকারীর বিপক্ষে একা পড়ে যেতে হয়েছিল। মেসির বিপক্ষে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে তা স্পেনের জন্য গুরুতর ঝুঁকির কারণ হতে পারে।
স্পেনকে তাই শুধু মেসির পায়ে বল যাওয়ার পর তাকে আটকানোর চেষ্টা করলে হবে না। বল কোথা থেকে তার কাছে পৌঁছাতে পারে, সেটিও বন্ধ করতে হবে। আর্জেন্টিনা বল পুনরুদ্ধার করার মুহূর্তে একজন স্প্যানিশ খেলোয়াড়কে সব সময় তার কাছাকাছি থাকতে হবে। তাকে ঘুরে দাড়ানোর, মাথা তুলে মাঠ দেখার কিংবা বল নিয়ে গতি তোলার সুযোগ দেয়া যাবে না। কারণ মেসি একবার সময় ও জায়গা পেলে সামনে কতজন ডিফেন্ডার আছেন, সেটি আর খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ থাকে না।
তবে তাকে আটকাতে গিয়ে অতিরিক্ত খেলোয়াড় নিয়োজিত করাও বিপজ্জনক। মেসির দিকে দুজন এগিয়ে গেলে এনজো ফার্নান্দেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার কিংবা লাউতারো মার্তিনেজ জায়গা পেয়ে যেতে পারেন। আবার তার পাসের পথ বন্ধ করতে পুরো দল নিচে নেমে গেলে আর্জেন্টিনা বক্সের সামনে স্থায়ী চাপ তৈরি করতে পারে। মেসির আতঙ্কের আসল প্রভাব এখানেই—তিনি কখনো কখনো বল স্পর্শ করার আগেই প্রতিপক্ষের কাঠামো বদলে দেন।
মেসিকে দেখে অনেক সময় মনে হয় তিনি হাঁটছেন, খেলা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছেন। কিন্তু সেই স্থিরতার আড়ালেই তিনি জায়গা খুঁজছেন, সতীর্থ ও প্রতিপক্ষের অবস্থান পড়ছেন এবং পরবর্তী আক্রমণের মানচিত্র তৈরি করছেন। কেপ ভার্দের বিপক্ষে একটি আক্রমণের আগে তিনি বল পাওয়ার জন্য ২২৪ বার নিজের অবস্থান বদলে সতীর্থদের কাছে পাসের বিকল্প তৈরি করেছিলেন। দৃশ্যমান দৌড়ের চেয়ে তার চলাচলের অর্থ তাই অনেক গভীর।
ফাইনালের আগে তাই স্পেনের সমস্যা কেবল একজন ফুটবলারকে আটকানো নয়; তাদের সামলাতে হবে সেই ভয়কেও, যা মেসি মাঠে নামার আগেই ছড়িয়ে দেন।
সুত্র:বণিক বার্তা
