উত্তরের পথে ঈদযাত্রা 

যমুনা সেতু-ঢাকা মহাসড়কে ৬ কারণে ৪ স্পটে জটের শঙ্কা 

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০২:৩৬ পিএম, বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬ | ৪৬

ঈদযাত্রায় যমুনাসেতু-টাঙ্গাইল-ঢাকা মহাসড়কে প্রধানত ছয়টি কারণে চার স্পটে যানজটের আশঙ্কা রয়েছে। ১৩ কিলোমিটারে ছয় লেনের গাড়ির চাপ পড়বে দুই লেনে। লক্কড়ঝক্কড় মার্কা লোকাল বাস মহাসড়কে বিকল হয়ে ভোগান্তি বাড়াবে। ফ্লাইওভার ও মহাসড়কে নির্মাণ কাজ চলমান থাকায় যান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা বাড়াবে। টোল আদায়ের ধীরগতি বা সাময়িক বন্ধ রাখা যানজটে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। সেতুতে মোটরসাইকেল বা বাইকের বাড়াবাড়ি মহাসড়কে যানজট সৃষ্টির সহায়ক ভূমিকা রাখবে। এছাড়া যে কোনো দুর্ঘটনা মহাসড়কে যানজট সৃষ্টির অন্যতম কারণ হিসেবে প্রতিবছর ধরা হয়। এবারও উত্তরের পথে ঈদযাত্রায় ওই ছয় কারণে এলেঙ্গা, গোলচত্বর, টোলপ্লাজা ও সেতুর ওপর এ চারটি প্রধানতম স্পটে যানজটের সমূহ আশঙ্কা রয়েছে।   

জানাগেছে, উত্তরের পথে ঈদ যাত্রায় যমুনাসেতু-টাঙ্গাইল-ঢাকা মহাসড়কে সাধারণত প্রতিদিন ২৪টি জেলার ২০-২২ হাজার যানবাহন চলাচল করে থাকে। মহাসড়কের এলেঙ্গা থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত সাড়ে ১৩ কিলোমিটার অংশ কয়েক বছর যাবত গলার কাঁটায় পরিনত হয়েছে। ঈদের সময় যমুনা সেতু পারাপার হওয়া যানবাহনের সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৬ হাজারের বেশি। ঢাকার দিক থেকে ছয় লেনে(সার্ভিস লেনসহ) আসা এই পরিবহনগুলো এলেঙ্গা থেকে দুই লেনে প্রবেশ করতেই গতি কমে যায়। ফলে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এর মাঝে ঢাকা থেকে আসা লক্কড়ঝক্কড় মার্কা ফিটনেস বিহীন লোকাল বাস মহাসড়কে বিকল হয়ে ভোগান্তি বাড়িয়ে দেয় কয়েক গুণ। এবারও প্রশাসন ঈদযাত্রা নিরাপদ করতে চাইলেও গাড়ি বিকল হওয়া, বাইকের বাড়াবাড়ি, দুর্ঘটনা, টোল আদায়ে সমস্যা এবং দুই লেন আর ছয় লেনের জটলায় ভোগান্তি থেকেই যাবে বলে জেলা প্রশাসনের তিন দফার নিরাপদ ঈদযাত্রার সভায় চিহ্নিত করা হয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্টরা উল্লেখিত বিষয়গুলোর সমাধানে দিনরাত কাজ করছেন। 

সড়ক বিভাগ সূত্র জানায়, মহাসড়কের টাঙ্গাইল অংশের গোড়াই থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত ছয় লেন মহাসড়ক চালু রয়েছে। এলেঙ্গা থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত সাড়ে ১৩ কিলোমিটার চার লেনের কাজ চলমান। এই মহাসড়কের টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার গোড়াই থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত ৬৫ কিলোমিটার টাঙ্গাইল জেলার মধ্যে পড়েছে। এই সড়ক হয়ে প্রতিদিন ২০-২২ হাজার যানবাহন সেতু পারাপার হয়। ঈদের ছুটি শুরু হলে যানবাহন পারাপারের সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। বিভিন্ন কলকারখানায় কর্মরত স্বল্প আয়ের মানুষ কম টাকায় ঢাকার লোকাল বাস বা বিকল্প পরিবহনে ঘরমুখী যাত্রা শুরু করেন। কিছু কিছু বাস পথে বিকল হয়ে পড়ে। বিকল হওয়া এসব গাড়ি সরাতে ২০-২৫ মিনিট সময়ের প্রয়োজন হয়। আর এতেই দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়- যা ছাড়াতে অনেক লম্বা সময় লেগে যায়।  সেতুর টোল প্লাজা সূত্র জানায়, গত বছর ঈদুল ফিতরের ছুটি হওয়ার পর ২৫ মার্চ ৪৮ হাজার ৩৬৮টি যানবাহন সেতু পারাপার হয়। ঈদুল আজহার ছুটি শুরু হওয়ার পর গত বছরের ১৫ জুন ৬৬ হাজার ৪৮৯টি যানবাহন সেতু পারাপার হয়। টোল আদায়ের বুথ বাড়িয়ে সড়কের শৃঙ্খলা রেখে নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করার সবকিছুর আয়োজন ঠিক ছিল। এরপরও লক্কড়ঝক্কড় মার্কা গাড়ি বিকল হয়ে ভোগান্তির সৃষ্টি করেছিল। 

টাঙ্গাইল শহর বাইপাস থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত ২৪ কিলোমিটার সড়ক সরেজমিন পরিদর্শন করে দেখা যায়, মহাসড়কের অবস্থা অনেকটাই ভালো। এলেঙ্গার পর থেকে চার লেনের কাজ চলছে। এলেঙ্গা বাসস্ট্যান্ডের পরে ফ্লাইওভারের কাজও চলছে। তবে সম্পূর্ণ সড়কেই চার লেন চালু আছে। 
সরেজমিনে মহাসড়কে চলাচলকারী নির্জন এন্টারপ্রাইজ বাসের হেলপার আব্দুল বাসেত, শ্রাবণ এন্টারপ্রাইজের বাস চালক সালাউদ্দিন, বাস চালক সাহেব আলী সহ অনেকেই জানান, ঈদ এলেই ফিটনেস বিহীন যানবাহন যত্রতত্রভাবে চলাচল করে। সেসব ফিটনেসবিহীন যানবাহন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে গুরুত্বপূর্ণ স্পটে বিকল হলেই ঈদের যানজট শুরু হয়ে যায়। কারণ সেই যানবাহন উদ্ধার করতে সর্বনি¤œ ৩০ মিনিট সময় লাগে। ঈদের সময়ে মহাসড়কে ৩০ মিনিট অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এ মহাসড়কের যমুনা সেতুর ওপর মোটরসাইকেল বা বাইকের চালকদের আরেক যন্ত্রণা শুরু হয়। তারা একটু ফাঁক পেলেই বাইকের মাথা ঢুকিয়ে দেন। যদিও বাইকের জন্য সেতু কর্তৃপক্ষ(বাসেক) আলাদা টোল বুথের ব্যবস্থা করেন- যদিও তা যথেষ্ট নয়। কিন্তু ভোগান্তি পোহাতে হয় সেতুর ওপর। ঈদের সময় সেতুতে যানবাহন ধীরগতি এবং একটার সাথে আরেকটা লাগালাগি করে চলাচল করে। সেই মুহূর্তে একটু জায়গা পেলেই বাইকের চালকরা মাথা ঢুকিয়ে দেয়। এতে অন্য সব যানবাহনের চালকদের বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়।  

তারা জানান, গত কয়েক বছর ধরে এলেঙ্গা থেকে সেতু পর্যন্ত সাড়ে ১৩ কিলোমিটারে ফোরলেনে উন্নীতকরণের কাজ চলছে। কাজের ধীরগতির কারণে দালক ও যাত্রী সাধারণ যন্ত্রণাদায়ক ভোগান্তি পোহাচ্ছেন। মহাসড়কে অনেক বড় বড় কাজ শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু এই সাড়ে ১৩ কিলোমিটারের কাজ অদৃশ্য কারণে শেষ হচ্ছে না। ঈদ এলে তারা বড় বড় বুলি ছাড়েন, সাময়িকভাবে কাজের গতি বাড়ালেও সারা বছরই কাজ থাকে গতিহীন।  

মহাসড়কে উন্নয়ন কাজে নিয়োজিত আব্দুল মোনেম লিমিটেড এর প্রজেক্ট ম্যানেজার রবিউল আউয়াল জানান, এলেঙ্গা থেকে সেতু পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১৩ কিলোমিটারের কাজ প্রায় শেষ। মহাসড়কের দুই পাশের সদ্য সম্পন্ন হওয়া চারলেন যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। এতে ঈদ যাত্রায় কোন সমস্যা হবে না। 

হাইওয়ে পুলিশের এলেঙ্গা ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. শরীফ জানান, গত বছরও ঈদে সেতুর ওপর এবং মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে যানবাহন বিকল হয়ে যানজটের সৃষ্টি হয়েছিল। ছয় লেনের সড়ক হলেও ফিটনেস বিহীন যানবাহন রাস্তায় নামলে যানজটের শঙ্কা থেকেই যায়। 

তিনি জানান, একটি যানবাহন বিকল হলে তা মহাসড়ক থেকে সরিয়ে নিতে নূন্যতম ১০ মিনিট সময় লাগলেও দীর্ঘ জটের সৃষ্টি হয়।

যমুনা সেতু সাইট অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ রিয়াজ উদ্দিন জানান, স্বাভাবিক অবস্থায় সেতুর পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে সাতটি করে বুথে টোল আদায় করা হয়। ঈদের ছুটি শুরু হলে সেতুর টোল প্লাজায় টোল আদায় বুথের সংখ্যা বাড়ানো হবে। প্রতিপ্রান্তে ৯টি করে ১৮টি বুথে টোল আদায় করা হবে। এছাড়া মোটরসাইকেল বা বাইকের জন্য পৃথক বুথ থাকবে। সেতুতে যানবাহন বিকল হলে বা দুর্ঘটনার শিকার হলে তা সরিয়ে নেওয়ার জন্য র‌্যাকার প্রস্তুত রাখা হবে।

টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার মুহম্মদ শামসুল আলম সরকার জানান, টাঙ্গাইলের রাবনা বাইপাস থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত ১৪ টি স্পট চিহ্নিত করা হয়েছে। মহাসড়কে ৩টি শিফটে ২৪ ঘণ্টাই পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। মহাসড়কের টাঙ্গাইল অংশকে চার ভাগ করে পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে। ঈদের ৫দিন আগে থেকে ঈদের পরে ৭দিন মহাসড়কে যানজট নিরসনে এক হাজার পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন।