টাইম ম্যাগাজিনের বিশ্লেষণ

ইরান যুদ্ধে প্রাথমিকভাবে ‘জয়ী’ রাশিয়া

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৪:১৯ পিএম, রোববার, ৮ মার্চ ২০২৬ | ৬৯

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর শুরু হওয়া সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অস্থিরতা তৈরি করেছে। শত শত মানুষ নিহত হয়েছে, লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতা নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এ যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্যও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, এই অস্থিরতার মধ্যেই একটি দেশ তুলনামূলকভাবে লাভবান অবস্থানে উঠে এসেছে—রাশিয়া।

ইরান যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহেই রাশিয়া এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছে যেখানে অন্য দেশগুলো যুদ্ধের খরচ বহন করলেও মস্কো অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক দিক থেকে কিছু সুবিধা নিতে পারছে। বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে আন্তর্জাতিক মনোযোগ সরে যাওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সামরিক জড়িত হওয়া—এই তিনটি কারণ রাশিয়ার জন্য পরিস্থিতিকে তুলনামূলকভাবে অনুকূল করে তুলেছে।

রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই তেহরানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার তীব্র সমালোচনা করেছে মস্কো। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২৮ ফেব্রুয়ারি এক বিবৃতিতে এ হামলাকে ‘একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিত ও অযৌক্তিক সশস্ত্র আগ্রাসন’ বলে অভিহিত করে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির হত্যাকাণ্ডকে ‘নিষ্ঠুর ও নিন্দনীয় হত্যাকাণ্ড’ বলে মন্তব্য করেন।

তবে একদিকে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক মিত্র হারানোর ঝুঁকি থাকলেও স্বল্পমেয়াদে রাশিয়া কিছু সুবিধা পেতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ইউরেশিয়া প্রোগ্রামের গবেষক রবার্ট পারসনের মতে, এ পরিস্থিতি অনুমান করা কঠিন ছিল না। তার ভাষায়, পুতিন ও তার উপদেষ্টারা সম্ভবত বুঝেছেন যে ইরান যুদ্ধ স্বল্পমেয়াদে রাশিয়ার স্বার্থেই কাজ করছে। পারসনের মতে, এর কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বাড়ছে যা বিশ্বের অন্যতম বড় জ্বালানি রপ্তানিকারক হিসেবে রাশিয়ার জন্য লাভজনক। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক মনোযোগ ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে সরে গিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে চলে যাচ্ছে। তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র আবারো মধ্যপ্রাচ্যের জটিল সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।

ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ২০২২ সাল থেকে রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এসব নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ছিল তেল রফতানির ওপর মূল্যসীমা, সম্পদ জব্দ, বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণসহ নানা অর্থনৈতিক চাপ, যার উদ্দেশ্য ছিল মস্কোর যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা কমিয়ে দেয়া।

এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে রুশ তেল কেনার কারণে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেছিল। কিন্তু ইরান যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বাড়তে শুরু করলে পরিস্থিতি কিছুটা বদলাতে থাকে। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট সাময়িকভাবে সেই শুল্কে ৩০ দিনের ছাড় দেয়ার ঘোষণা দেন। তিনি জানান, সমুদ্রে আটকে থাকা রুশ তেল কেনার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যদিও এ পদক্ষেপ স্বল্পমেয়াদি।

তবু ক্রেমলিনের দাবি, ইরান যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার জ্বালানি পণ্যের চাহিদা বাড়তে শুরু করেছে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রুশ জ্বালানি পণ্যের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

যুদ্ধ শুরুর আগে রাশিয়ার জ্বালানি খাত কঠিন সময় পার করছিল। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও তুলনামূলক কম তেলের দাম রাশিয়ার অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করেছিল। ২০২১ সালে রাশিয়ার ফেডারেল বাজেটের প্রায় ৪৫ শতাংশ আয় আসত তেল ও গ্যাস থেকে। কিন্তু ২০২৫ সালে তা কমে প্রায় ২০ শতাংশে নেমে আসে।

কিন্তু ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বৈশ্বিক তেল সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় বাজারে দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করে। এর ফলে রাশিয়ার মতো তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো নতুন সুযোগ পেতে পারে। যুদ্ধের আগে রাশিয়া আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল তেল প্রায় ১০ থেকে ১৩ ডলার ছাড় দিয়ে বিক্রি করতে বাধ্য ছিল। এখন সেই তেলই প্রতি ব্যারেলে প্রায় ৪ থেকে ৫ ডলার প্রিমিয়ামে বিক্রি হচ্ছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে।

জ্বালানির দাম বাড়ার পাশাপাশি যুদ্ধের আরেকটি প্রভাব ইউক্রেনের ওপরও পড়তে পারে, যা রাশিয়ার জন্য কৌশলগত সুবিধা তৈরি করতে পারে। ইউক্রেন ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতিতে ভুগছিল। এখন মধ্যপ্রাচ্যে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র একই ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিরক্ষা ও মহাকাশবিষয়ক কমিশনার আন্দ্রিউস কুবিলিয়াস সতর্ক করে বলেছেন, ইউক্রেনের জন্য পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে উঠতে পারে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র একসঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চল, নিজের বাহিনী এবং ইউক্রেন—তিন জায়গায় পর্যাপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করতে পারবে না।

ইউক্রেনের দুর্বলতা শনিবার রাতে আবারো স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যখন রাশিয়া খারকিভ শহরে অন্তত ৪৫০টি ড্রোন ও ১৯টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় বলে ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা জানান। এতে অন্তত ১০ জন নিহত হয়।

এদিকে যুদ্ধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গোয়েন্দা সহযোগিতা। কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়া নাকি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থান সম্পর্কিত কিছু গোয়েন্দা তথ্য ইরানের সঙ্গে ভাগাভাগি করেছে। এসব তথ্যের মধ্যে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ, বিমান এবং অন্যান্য সামরিক স্থাপনার অবস্থানও থাকতে পারে বলে দাবি করা হয়েছে।

যদিও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা রাশিয়ার এই ভূমিকা অস্বীকার করেননি, তারা বিষয়টির গুরুত্ব কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, কেউ আমাদের বিপদে ফেলতে পারবে না। আমাদের কমান্ডাররা সব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে পদক্ষেপ নিচ্ছেন। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রভাবকে দুর্বল করা—এই দুটি লক্ষ্য পূরণ হলে সেটিই রাশিয়ার জন্য বড় কৌশলগত লাভ হবে।

ফলে সব মিলিয়ে ইরান যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, ততই বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে নতুন পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হবে। আর সেই পরিবর্তনের প্রথম পর্যায়ে, অন্তত আপাতদৃষ্টিতে, রাশিয়া নিজেকে একটি সুবিধাজনক অবস্থানে দেখতে পাচ্ছে।