ভেনিজুয়েলায় মার্কিন হামলা যুক্তরাষ্ট্রের নব্য সাম্রাজ্যবাদ, গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ
ভেনিজুয়েলায় সামরিক হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এ পদক্ষেপ গত দুই শতাব্দীর ইতিহাসে পূর্বদক্ষিণ, মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের ধারাবাহিকতার অংশ।
তবে এটি দক্ষিণ আমেরিকার কোনো দেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম সরাসরি সামরিক হামলা হিসেবে নজিরবিহীন। মাদুরোকে আটক করার পর এক সংবাদ সম্মেলনে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘পশ্চিম গোলার্ধে আমেরিকার আধিপত্য আর কখনো প্রশ্নবিদ্ধ হবে না।’
১৮৪০ সাল থেকে কেবল অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে নয়, সামরিকভাবেও প্রতিবেশী দেশগুলোর রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে রয়েছে অবরুদ্ধ, দখল ও রণকৌশলগত কর্মকাণ্ড। ব্রাজিল, চিলি ও আর্জেন্টিনার মতো দেশে গোপন অভিযান চালিয়ে নির্বাচিত সরকার উৎখাত ও সামরিক স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠার মতো কাজ করেছে মার্কিন ডিপস্টেট। তবে সাধারণত সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের ঘটনাগুলো মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল।
রিও ডি জেনেইরোর স্টেট ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক মাউরিসিও স্যান্তোরো বলেন, দক্ষিণ আমেরিকার দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি হামলা বিদেশনীতি ও প্রতিরক্ষা নীতিতে একটি বড় পরিবর্তনের সূচক। নতুন কৌশলে আমেরিকার সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি ও মনরো নীতি (১৮২৩ সালে প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো প্রবর্তিত ‘আমেরিকায় আমেরিকার জন্য’ নীতি) অনুসরণের চেষ্টা করা হয়েছে। এ নীতি অতীতে মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকায় মার্কিন-সমর্থিত সামরিক অভ্যুত্থানকে বৈধতা দিয়েছিল।
টেম্পল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক অ্যালান ম্যাকফারসন বলেন, রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে সরাসরি সামরিক শক্তি ব্যবহার যুক্তরাষ্ট্রের পুরনো কৌশল। তবে ধারণা করা হয়েছিল, লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের পুরোনো সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপের অধ্যায় শেষ হয়ে গেছে। ২১ শতকে এমন আগ্রাসী নীতি আর দেখা যাবে না। কিন্তু ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক হস্তক্ষেপ প্রমাণ করেছে, সেই ধারণা ভুল। বাস্তবে আজও যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহার করে অঞ্চলটির রাজনৈতিক বাস্তবতা নিজেদের অনুকূলে নিতে প্রস্তুত।
ইতিহাসের উদাহরণ
গত কয়েক দশকে অঞ্চলটির প্রায় প্রতিটি দেশই কোনো না কোনোভাবে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের শিকার হয়েছে। কখনো প্রকাশ্য সামরিক অভিযান, আবার কখনো গোপন রাজনৈতিক ও গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে। নিচে তার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ তুলে ধরা হলো।
মেক্সিকো: ১৮৪৭ সালে টেক্সাসের সংযুক্তি ও সীমান্ত সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র মেক্সিকো শহর দখল করে। ১৮৪৮ সালের শান্তিচুক্তিতে মেক্সিকো মোট ভূমির ৫৫ শতাংশ হারায়, যার মধ্যে বর্তমানে ক্যালিফোর্নিয়া, নেভাদা, উটাহ, অ্যারিজোনা, নিউ মেক্সিকো, কলোরাডো ও ওয়াইয়োমিং অন্তর্ভুক্ত।
কিউবা: ১৮৯৮ সালে কিউবার স্বাধীনতা যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র স্পেনের বিরুদ্ধে সহায়তা করে। বিজয়ের পর তারা পুয়ের্তো রিকো নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং ১৯০২ পর্যন্ত কিউবায় আধিপত্য বজায় রাখে। পরে ফিদেল কাস্ত্রোর বিপ্লবের পর ১৯৬১ সালে ‘বে অব পিগস’ অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ ব্যর্থ হয়।
হাইতি: ১৯১৫ সালে অস্থিতিশীলতার অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র হাইতিতে প্রবেশ করে দেশটির কাস্টমস, ট্রেজারি ও ন্যাশনাল ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ নেয়। ১৯৩৪ পর্যন্ত এ নিয়ন্ত্রণ জারি রাখে। ১৯৫৯ সালে প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া দুভালিয়ের বিপ্লবের প্রচেষ্টা ব্যর্থ করতে সিআইএ তাকে রক্ষা করে।
ব্রাজিল: ১৯৬৪ সালে ব্রাজিলের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত বামপন্থি প্রেসিডেন্ট জোয়াও গুলার্তকে উৎখাতকারী সামরিক অভ্যুত্থানে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেনি যুক্তরাষ্ট্র। তবে প্রস্তুতি হিসেবে ব্রাজিল উপকূলে একটি নৌবহর মোতায়েন করেছিল।
এর পরের দশকে, ১৯৭০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ও এফবিআই ব্রাজিল, চিলি ও আর্জেন্টিনার সামরিক স্বৈরশাসনগুলোর দমনমূলক নিরাপত্তা কাঠামোকে সরাসরি পরামর্শ ও সহযোগিতা দেয়। এ সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমে বিরোধীদের নিপীড়ন, অপহরণ ও হত্যাকাণ্ড চালানো হয়, যা ইতিহাসে ‘অপারেশন কনডর’ নামে পরিচিত।
পানামা: ১৯০৩ সালে পানামা কলম্বিয়া থেকে আলাদা হলে যুক্তরাষ্ট্র তা সমর্থন করে। ১৯৮৯ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ নরিয়েগাকে আটক করতে ২৭ হাজার মার্কিন সেনা নিয়ে দেশটি আক্রমণ করে। এ অভিযানে প্রায় ২০০-৫০০ নাগরিক ও ৩০০ পানামা সেনা নিহত হয়। এরপর নির্বাচিত গিলার্মো এন্ডারা যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে রাষ্ট্রপতি হন।
